বুধবার, সেপ্টেম্বর ২, ২০২৬
১৮ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> সফর শেষে ঢাকা ছাড়লেন আইপিইউ মহাসচিব

>> জয়পুরহাটে হাতকড়া পরেই মায়ের জানাজায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা

>> ‘কখনো কখনো মনে হয়, বেঁচে থাকাটাই অর্থহীন’—নেপালের বন্যায় স্বজনহারা শ্রমিক

>> রোগীর মৃত্যু নিয়ে সংঘর্ষ, চার ছাত্রদল নেতাসহ ৬ জন আটক

>> হাসপাতালে জ্বালানিমন্ত্রীকে দেখতে গেলেন রাষ্ট্রপতি

>> চট্টগ্রাম বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ, সেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

>> চোট নিয়ে ব্যাটিং না করায় ইমামের বিরুদ্ধে তদন্ত, ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত

>> টাঙ্গাইলের চাকরি মেলায় ৪৪৬ জনের তাৎক্ষণিক নিয়োগ, আরও চাকরি পাবেন ১,৫৮১ জন

>> ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড পুনর্গঠন, যুক্ত হলেন দুই সংসদ সদস্য ও তিন আলেম

>> লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে ফিরলেন দুই বাংলাদেশি, বললেন দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা

আপনি পড়ছেন : জীবনযাত্রা

লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে ফিরলেন দুই বাংলাদেশি, বললেন দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা


Rabeya ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:০২



লিবিয়ার বন্দিশিবির থেকে ফিরলেন দুই বাংলাদেশি, বললেন দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা


‘ভাতের জন্যই অপেক্ষা করতাম। মুখে দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। বিমানে ভাত দেখে মনে হয়েছে পেট ভরে গেছে।’

লিবিয়ার বন্দিশিবিরে টানা ৪৫ দিন কাটানোর পর দেশে ফেরার পথে বিমানে ভাত পেয়ে এভাবেই নিজের অনুভূতির কথা বলছিলেন মাদারীপুরের মশিউর রহমান। দীর্ঘ বন্দিজীবন শেষে মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় আরও ১৭৩ বাংলাদেশির সঙ্গে দেশে ফেরেন তিনি।

ত্রিপলির তাজুরা ডিটেনশন সেন্টার থেকে বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর মশিউরের সঙ্গে ছিলেন মাদারীপুরের আরেক যুবক সোহেল মিয়া। দুজনের পরনে একই ধরনের নেভি-ব্লু ট্র্যাকস্যুট, হাতে আইওএমের দেওয়া ব্যাগ। বিমানবন্দর থেকে বাসে করে গুলিস্তানে যাওয়ার সময় তাঁরা তুলে ধরেন লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা।

ব্যবসা ছেড়ে ইউরোপের স্বপ্নে মশিউর

৩৮ বছর বয়সী মশিউর রহমানের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ দুধখালী গ্রামে। দেশে তাঁর একটি খাবারের দোকান ছিল। পরোটা ও শিঙাড়া তৈরিতে দক্ষ হওয়ায় ব্যবসাও ভালো চলছিল।

তবে তাঁর ছোট ভাই প্রায় পাঁচ বছর ধরে ইতালিতে থাকেন। ভাইয়ের বিদেশে থাকা এবং ভালো উপার্জনের গল্প থেকেই মশিউরের মধ্যেও ইউরোপ যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। পরিবার ও ছোট ভাই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেতে নিষেধ করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের কথা না শুনেই লিবিয়ার উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পৌঁছাতে মশিউরের সময় লাগে প্রায় নয় মাস। প্রথমে মালয়েশিয়া, এরপর শ্রীলঙ্কা ও কুয়েত হয়ে তিনি মিসরে যান। সেখানে প্রায় পাঁচ মাস থাকার পর দালালের মাধ্যমে তাঁকে নেওয়া হয় লিবিয়ার উপকূলীয় শহর আল-খমসে।

সেখানে একটি ‘গেম ঘরে’ প্রায় তিন মাস আটকে রাখা হয় তাঁকে। এ সময় বিভিন্ন কিস্তিতে দালালকে দিতে হয় প্রায় ৩২ লাখ টাকা। লিবিয়ায় বন্দি করা ও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হতো। শেষ পর্যন্ত স্বজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে সেই অর্থ জোগাড় করতে হয় মশিউরের পরিবারকে।

সমুদ্রযাত্রার আগেই ধরা

প্রায় তিন মাস আগে খমস থেকে কাঠের নৌকায় ৩০ বাংলাদেশি ও চার মিসরীয়কে নিয়ে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। মানব পাচারের এই সমুদ্রপথকে সেখানে ‘গেম’ বলা হয়।

তবে নৌকাটি বেশি দূর যেতে পারেনি। যাত্রা শুরুর প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই লিবিয়ার সেনাদের হাতে ধরা পড়ে সেটি। পরে মশিউরসহ সবাইকে নেওয়া হয় তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে।

সেখানে ৪৫ দিন কাটাতে হয় তাঁকে। মশিউরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০ জন থাকার উপযোগী একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল প্রায় ৫০০ মানুষকে। দায়িত্বে থাকা নাইজেরিয়ানদের হাতে বন্দিদের মারধরের শিকার হতে হতো।

মশিউর বলেন, ভাষা বুঝতে না পারায় সামান্য বিষয়েও তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। তাঁর স্মৃতিতে এখনো ভেসে ওঠে হাতে থাকা লম্বা পাইপ দিয়ে মারধরের দৃশ্য।

৪৫ দিনে একবারও ভাত পাননি

বন্দিশিবিরে সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল খাবারের অভাব। ৪৫ দিনের মধ্যে একবারও ভাত খেতে পারেননি মশিউর।

সকালে দেওয়া হতো মোটা রুটি, যাকে সেখানে ‘খুবজ’ বলা হয়। দুপুরে মিলত পাস্তা। সাতজনের জন্য বরাদ্দ থাকত মাঝারি আকারের এক বাটি খাবার। দুপুরের রান্না করা খাবারই আবার রাতে খেতে দেওয়া হতো।

ক্ষুধা মেটার মতো খাবার না থাকায় বাধ্য হয়ে সেটিই খেতে হতো বন্দিদের। খাবারের সময় প্রায়ই কেউ না কেউ কান্নায় ভেঙে পড়তেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নিরাপদ পানির সংকট। কলের লবণাক্ত পানিই পান করতে হতো তাঁদের।

সোহেলের খরচ ৩৯ লাখ টাকা

মশিউরের পাশে থাকা ৩৬ বছর বয়সী সোহেল মিয়ার বাড়িও মাদারীপুরে, রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট এলাকায়। দেশে তিনি অটোরিকশা চালাতেন।

গ্রামের অনেক তরুণের মতো তাঁরও স্বপ্ন ছিল ইউরোপে গিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া। ১৪ মাস আগে ইতালির উদ্দেশে যাত্রা করেন তিনি। মশিউরের মতোই মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, কুয়েত ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছান।

ইতালি যাওয়ার আশায় ধাপে ধাপে দালালদের প্রায় ৩৯ লাখ টাকা দেন সোহেল। প্রথমে ১৭ লাখ এবং পরে আরও ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এই অর্থ জোগাড় করতে তাঁর পরিবারকে পৈতৃক জমিজমা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে।

এরপরও ইতালি যাওয়ার ব্যবস্থা না হওয়ায় শেষবারের মতো সুমন নামের আরেক দালালের মাধ্যমে আরও ১০ লাখ টাকা দিয়ে নিজে ‘গেমে’ যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

খমস থেকে ফাইবারের নৌকায় সমুদ্রযাত্রা শুরুর এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই সেনাদের হাতে ধরা পড়েন সোহেল ও তাঁর সঙ্গীরা।

বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কা

সোহেলের ভাষ্য অনুযায়ী, আটকের পর তাঁদের অন্য মানব পাচারকারীর কাছে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেখান থেকে মুক্তি পেতে আরও ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রয়োজন ছিল।

এ অবস্থায় তাঁরা লিবিয়ার সেনাদের কাছে অনুরোধ করেন, অন্য কারও কাছে বিক্রি না করে যেন তাঁদের তাজুরা ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। কারণ সেখানে আইওএমের কার্যক্রম রয়েছে এবং সেখান থেকে দেশে ফেরার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

শেষ পর্যন্ত তাজুরা বন্দিশিবিরেই ৪৮ দিন কাটিয়ে দেশে ফেরেন সোহেল।

ঈদের দিনও ছিল শুধু কান্না

মশিউরের মতো সোহেলেরও সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে খাবারের অভাবে। তবে তীব্র গরমও তাঁর জন্য ছিল বড় দুর্ভোগের কারণ। কক্ষে ফ্যান থাকলেও এত মানুষের তুলনায় তা ছিল অপ্রতুল। ফলে ভেতরের পরিবেশ হয়ে উঠত অসহনীয়।

বন্দিশিবিরে জীবনের অন্যতম কষ্টের কোরবানির ঈদ কাটিয়েছেন সোহেল। অন্য দিনের মতো সেদিনও পাস্তা খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে।

সেই দিনের কথা মনে করে সোহেল জানান, ঈদের দিনটিও তিনি কাটিয়েছেন কান্নায়। শুধু সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করেছেন, যেন দেশে ফেরার সুযোগ পাওয়ার আগে তাঁর মৃত্যু না হয়।

দেশে ফিরেও ঋণের বোঝা

দেশে ফেরার পর দুই যুবকের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দালালদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে তাঁদের প্রয়োজনীয় যোগাযোগ নম্বর দেওয়া হয়েছে। আইওএমও যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ রাখতে বলেছে।

সোহেল এখন আর বিদেশে যেতে চান না। তাঁর আশা, দেশে ফিরে কোনোভাবে একটি অটোরিকশার ব্যবস্থা করতে পারলে পরিশ্রম করে পরিবারের ঋণ পরিশোধ করবেন।

মশিউরের অবস্থাও স্বস্তির নয়। বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণ এখন তাঁর মাথায়। আপাতত গ্রামে ফিরে যেতে চান তিনি। ভবিষ্যৎ কী হবে, তা সৃষ্টিকর্তার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

তবে ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্ন পুরোপুরি মাথা থেকে মুছে ফেলতে পারেননি মশিউর। দীর্ঘ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও হাসতে হাসতে তিনি জানান, একবার ইতালির স্বপ্ন মাথায় ঢুকে গেলে তা সহজে বের করা কঠিন।

কেন থামছে না ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা?

উন্নত জীবন ও বেশি আয়ের আশায় প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁদের বড় একটি অংশের গন্তব্য ইতালি। দালালদের মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়ে সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা।

এই পথে কেউ গন্তব্যে পৌঁছালেও অনেকে নৌকাডুবি ও দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তবু ইউরোপে গিয়ে ভালো উপার্জনের স্বপ্নে থামছে না এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা।

মশিউরের মতে, এটিই মূলত একটি ফাঁদ। পরিচিত কেউ ইতালি গিয়ে ভালো বেতন পাচ্ছেন—এমন খবর শুনে অনেকেই বাস্তব ঝুঁকির কথা ভুলে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই বোঝা যায় পথটি কতটা ভয়াবহ।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মশিউর স্বীকার করেন, তাঁর ছোট ভাইও তাঁকে এই পথে যেতে নিষেধ করেছিলেন। তখন তিনি বিষয়টি বুঝতে পারেননি; এখন সব হারিয়ে সেই সতর্কতার গুরুত্ব বুঝতে পারছেন।

‘আর কেউ এই ভুল করবেন না’

গুলিস্তানে বাস থেকে নামার পর মাদারীপুরের বাস ধরতে দ্রুত হাঁটছিলেন মশিউর ও সোহেল। বাড়ি ফেরার তাড়া তাঁদের চোখেমুখে স্পষ্ট।

ছবি তোলার অনুরোধে সোহেল উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর আশঙ্কা, গণমাধ্যমে তাঁদের ছবি প্রকাশিত হলে দালালরা বিষয়টি ব্যবহার করে পাওনা টাকা না দেওয়ার অজুহাত তৈরি করতে পারে।

শেষে সোহেল দেশের মানুষের কাছে তাঁদের জন্য দোয়া চেয়েছেন। একই সঙ্গে অন্যদের উদ্দেশে তাঁর সতর্কবার্তা—শুধু ইউরোপে ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখে দালালের কথায় এমন ঝুঁকিপূর্ণ পথে যেন কেউ না পা বাড়ান।