বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না—এমন নিশ্চয়তা চেয়ে যুক্তরাজ্য সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ কামনা করেছেন দেশটির ছয়জন রাজনীতিক। একই সঙ্গে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা এবং বিচারপ্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডকে পাঠানো এক চিঠিতে এসব দাবি তুলে ধরেন রাজনীতিকেরা। যুক্তরাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক অনলাইন মাধ্যম ‘কমেন্ট সেন্ট্রাল’ চিঠির বিষয়টি প্রকাশ করে। গত ৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ উদ্যোগের কথা জানান দেশটির কনজারভেটিভ পার্টির সংসদ সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান।
চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন ছয় রাজনীতিক। তাঁরা হলেন—বব ব্ল্যাকম্যান, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য চার্লস ট্যানক, মার্টিন ডে, পল ম্যাকলেনান, অ্যালান ব্রাউন ও সীমাস লোগান।
চিঠিতে চারটি দাবি
চিঠিতে যুক্তরাজ্য সরকারের কাছে চারটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রথম দাবিতে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ফিরলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে না—বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে এমন লিখিত নিশ্চয়তা আদায় করতে হবে। পাশাপাশি দেশে ফেরার পর তাঁকে নির্যাতন, গুম কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনাকে নিজের পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী নিয়োগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া রায় ও সাজা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দিতে হবে। তাঁকে আটক করা হলে সেই প্রক্রিয়াও স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা হস্তক্ষেপ হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ কাজে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে (ওএইচসিএইচআর) যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন তাঁরা।
চতুর্থত, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংলাপ আয়োজনের জন্য যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
তবে চিঠিতে রাজনীতিকেরা স্পষ্ট করেছেন, শেখ হাসিনাকে দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি তাঁদের নয়। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার নেতাদের স্বাধীন তদন্তে সহযোগিতা এবং সহিংসতা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত জবাবও চেয়েছেন চিঠির স্বাক্ষরকারীরা। পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনকে বাংলাদেশের সরকার, অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক মিশন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনাকে ফেরাতে আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক তৎপরতা
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের রাজনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে আওয়ামী লীগও।
গত ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নেতা হাবিব মিল্লাত ছয় ব্রিটিশ রাজনীতিকের চিঠিতে স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারত চলে যান শেখ হাসিনা। ২০২৫ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। তবে শেখ হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করে বিচারপ্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সম্প্রতি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা আবারও জানান তিনি। দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার, কারাবাস কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ সরকার ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে চায়। গত ৫ নভেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, তাঁকে ফিরিয়ে আনতে পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথির প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।