ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় যে, ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানীর একটি বাসা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরিচয় যাচাইয়ের পর তাঁকে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশ তাঁকে দীর্ঘদিনের পলাতক আসামি হিসেবে উল্লেখ করলেও তাঁর বিরুদ্ধে বর্তমানে কোন আইনি বা সামরিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রকাশিত বিভিন্ন বই ও ঐতিহাসিক বর্ণনায় মেজর মোজাফফরের নাম এসেছে। এসব সূত্রে দাবি করা হয়, ঘটনাস্থলে উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে তিনি ছিলেন এবং জিয়ার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছিলেন।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর Bangladesh: A Legacy of Blood গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হামলাকারীরা সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমানকে খুঁজছিলেন। তাঁর বর্ণনায় বলা হয়, জিয়া কক্ষ থেকে বের হলে মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন তাঁর নিকটেই ছিলেন। বইটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, তাঁরা ধারণা করেছিলেন জিয়াকে হত্যা নয়, বরং আটক করে নিয়ে যাওয়া হবে। পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান গুলি চালান বলে ওই বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
তবে এসব তথ্য কোনো আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে যাচাই হয়নি এবং এগুলো লেখকের বর্ণনার অংশ হিসেবে বিবেচিত।
একই বইয়ে আরও দাবি করা হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডের কিছু সময় পর মেজর মোজাফফরসহ কয়েকজন কর্মকর্তা পুনরায় সার্কিট হাউসে যান। সেখানে রাষ্ট্রপতির কক্ষ তল্লাশি, কিছু নথি ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজার চেষ্টা এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরে নিহতদের মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও বইটিতে বর্ণিত হয়েছে।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকেও তাঁর উপস্থিতির দাবি করা হয়েছে। এসব তথ্য সত্য হলে হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা পালানোর চেষ্টা করেন। পথে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত বা গ্রেপ্তার হলেও মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরবর্তী সময়ে তাঁকে দীর্ঘদিন পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
জিয়া হত্যার ঘটনায় সামরিক আদালতে একাধিক সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়েছিল। তবে মোজাফফর গ্রেপ্তার না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে সেই সময় কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথায় উল্লেখ রয়েছে, আশির দশকের শেষ দিকে পলাতক মেজর খালেদ ব্যাংককে এবং মেজর মোজাফফর ভারতে অবস্থান করছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
সেই আলোচনার ভিত্তিতে বইটিতে বলা হয়, পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল জিয়াউর রহমানকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া; হত্যা করা নয়। তবে এই বক্তব্যও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজস্ব দাবি এবং আদালতে পরীক্ষা বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
তবে এখনো অজানা রয়ে গেছে—
এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
মোজাফফরের জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আশা করছেন পর্যবেক্ষকরা। যেমন—
গ্রেপ্তারের পর মেজর মোজাফফরের নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, পুরোনো সামরিক তদন্তের পূর্ণ নথি বা বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।