সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬
২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢুকে বড় শহরগুলোতে গড়ে উঠছে বড় বাজার

>> সেপটিক ট্যাংকের নোংরা পানিতে দুই দিন, অবশেষে জীবিত উদ্ধার কুকুর

>> ট্রাম্পের পোস্টে নিউ মেক্সিকো হয়ে গেল ‘নিউ আমেরিকা’, শুরু বিতর্ক

>> জ্বালানি নিরাপত্তায় বদলে যাওয়া বাস্তবতা, বাংলাদেশের জন্য যে সতর্কবার্তা

>> হাওরে জমজমাট নৌকাবাইচ, সুরমা নদীতে হাজারো দর্শকের ভিড়

>> ২২৮ বছরের পুরোনো রেস্তোরাঁ, অতিথি তালিকায় ডিকেন্স থেকে ম্যাডোনা

>> বাংলাদেশ-ভারতের বন্ধ তিন ট্রেন চালুর উদ্যোগ, নতুন রুটের প্রস্তাবও থাকছে

>> আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত, জুলাইয়ের তুলনায় প্রাণহানি বেড়েছে

>> নেপালের বন্যার ভিডিও বলে ছড়ানো ফুটেজ আসলে অন্য দেশের, পুরোনোও

>> ‘কসমেটিক সার্জারি’ নয়, সমস্যার মূলে যেতে পাকিস্তানকে বললেন মিসবাহ

আপনি পড়ছেন : কিশোরগঞ্জ

হাওরে জমজমাট নৌকাবাইচ, সুরমা নদীতে হাজারো দর্শকের ভিড়


Rabeya ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৪৯



হাওরে জমজমাট নৌকাবাইচ, সুরমা নদীতে হাজারো দর্শকের ভিড়


কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার সুরমা নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। ঢাকঢোলের শব্দ, মাঝিদের হইহুল্লোড় আর ছন্দ মিলিয়ে বইঠা চালানোর দৃশ্যে নদীর দুই তীরজুড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই নদীর পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ।

গত শনিবার ইটনা উপজেলার ধনপুর বাজারসংলগ্ন এলাকায় দিনব্যাপী এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। শুধু কিশোরগঞ্জ নয়, সীমান্তঘেঁষা এলাকা হওয়ায় হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন জায়গা থেকেও দর্শনার্থীরা এসে অংশ নেন উৎসবে। ধনপুর বাজার ও আশপাশের বাড়িগুলোতেও দেখা যায় অতিথিদের আনাগোনা।

ইটনার আড়ালিয়া এলাকা থেকে প্রায় ৩০ জনের সঙ্গে নৌকায় করে বাইচ দেখতে আসেন ২৫ বছর বয়সী আরাফাত ইসলাম। জীবনে প্রথমবার নৌকাবাইচ দেখার সুযোগ পেয়ে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নদীতেই সময় কাটান তিনি। দীর্ঘ সময় থাকার প্রস্তুতি হিসেবে নিজেদের নৌকাতেই দুপুরের খাবার রান্নার ব্যবস্থা করেন তাঁরা।

আয়োজকদের মতে, তরুণদের মাদক ও অপরাধ থেকে দূরে রেখে খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের প্রতি আগ্রহী করা এবং হাওরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই ছিল এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাইচ শুরু হতেই উৎসবের রূপ নদীতে

বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মোট ১২টি নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সকাল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে। কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, আবার অনেকে নৌকা ভাড়া করে নদীর মাঝখানে গিয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন।

প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পর পুরো নদীর পরিবেশই বদলে যায়। ঢাকের তালে মাঝিদের সম্মিলিত হাঁকডাক আর একই ছন্দে বইঠা চালানোর দৃশ্যে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা। প্রতিটি দল জয়ের জন্য সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে নৌকা চালাতে থাকে।

কখনো একটি নৌকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে সামনে চলে যায়, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্য নৌকা তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায়। দুই তীরের দর্শকেরাও পছন্দের দলকে সমর্থন জানাতে হাততালি ও উল্লাসে মুখর করে তোলেন চারপাশ। অনেকে মুঠোফোনে ধারণ করেন প্রতিযোগিতার মুহূর্তগুলো।

হাওরপ্রধান ইটনা উপজেলার মানুষের সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেলে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াতে নৌকাই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা। সেই জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলেই বহু বছর ধরে এ অঞ্চলে চলে আসছে নৌকাবাইচের আয়োজন।

তবে আধুনিকতার প্রভাবে নিয়মিত এমন আয়োজন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকা এই লোকজ সংস্কৃতিকে আবারও মানুষের সামনে তুলে ধরতে নৌকাবাইচের আয়োজন করেছে ধনপুর ইউনিয়নবাসী।

বিজয়ীর হাতে ‘সোনার হরিণ’

এবারের প্রতিযোগিতায় তীব্র লড়াই শেষে প্রথম স্থান অর্জন করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা শাপলা বয়েজ ক্লাব। তারা ইটনার ধনপুর ঘোষপাড়ার প্রতিনিধিত্ব করে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

বিজয়ী দলের হাতে প্রথম পুরস্কার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় ‘সোনার হরিণ’। দ্বিতীয় হওয়া দল পেয়েছে ‘রুপার ময়ূর’ এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের পুরস্কার ছিল একটি এলইডি টেলিভিশন। পুরস্কার পাওয়ার পর বিজয়ী দল ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক আনন্দ-উচ্ছ্বাস।

স্থানীয় বাসিন্দা সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন, একসময় গ্রামের বিভিন্ন উৎসব ও বিনোদনের আয়োজনে লোকজ সংস্কৃতি ছিল অবিচ্ছেদ্য অংশ। জারি, সারি, ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা, কাবাডি কিংবা নৌকাবাইচ—এসব ছিল মানুষের বিনোদনের বড় মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে এসব আয়োজন কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্ম এসব ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর এমন নৌকাবাইচ আয়োজন তরুণদের নিজেদের সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।

নৌকাবাইচ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম রেখা এবং ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর।

হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকার গভীর সম্পর্ক থাকায় সুরমা নদীর এই আয়োজন শুধু প্রতিযোগিতা বা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে।