রাত সাড়ে ১০টার দিকে দুটি অ্যাম্বুলেন্স কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ায় পৌঁছায়। দেবাশীষের বাড়ির সামনের সড়কটি সরু হওয়ায় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে সেখানে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও ধর্মের মানুষ শেষবারের মতো তাঁদের শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে জড়ো হন।
পরে মরদেহগুলো বাড়ির কাছাকাছি তরুণ সংঘ পাঠাগারের সামনে নেওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দেবাশীষের মরদেহ দেখে তাঁর মা স্বপ্ন দত্ত কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শোক সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। পরিবারের একমাত্র জীবিত সন্তানদের মধ্যে এখন তাঁর সাত বছর বয়সী নাতনি মহিমা দত্ত এবং অসুস্থ মেয়ে রয়েছেন।
বাবার মরদেহের সামনে মহিমাকেও নীরব ও বিষণ্ন অবস্থায় দেখা যায়। স্বজনদের কাছে থাকা শিশুটি বাবার মরদেহের দিকে তাকাতেও চাইছিল না।
পরে দেবাশীষ দত্ত ও তাঁর ছোট ছেলে শর্ণশীষ দত্তের মরদেহ কুষ্টিয়া মহাশ্মশানে নেওয়া হয়। রাত দুইটার পর সেখানে বাবা-ছেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
অন্যদিকে, একই রাতে দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন ও শ্বশুর আকরাম আলীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া থানাপাড়া মডেল জামে মসজিদে। রাত তিনটার দিকে তাঁদের কুষ্টিয়া পৌর কবরস্থানে দাফন করা হয়।
চারজনের সৎকার ও দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ দেবাশীষের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবার হাতে এই অর্থ তুলে দেন।
এর আগে শনিবার সন্ধ্যায় বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে মরদেহবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্স কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করে। কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার একটি হিমঘর থেকে মরদেহগুলো নিয়ে গাড়ি দুটি ভারতের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশনে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মরদেহ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।
দেবাশীষ গত ৩ আগস্ট স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। পরে তাঁর শ্বশুরও সেখানে যান। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে ১৭ আগস্ট তাঁরা কলকাতায় ফেরেন। ১৯ আগস্ট তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল।
কিন্তু তার আগেই ১৮ আগস্ট গভীর রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে। ওই ঘটনায় মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একই পরিবারের চারজনই কুষ্টিয়ার বাসিন্দা।
দেবাশীষ দত্ত সাংবাদিকতা পেশায় দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ছিলেন। তিনি আজকের পত্রিকা ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নাইন-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে।