বাংলাদেশের ক্রিকেটে বাঁহাতি পেসার মোস্তাফিজুর রহমানের আগমন যেন ছিল ঝড়ের মতো। কাটার, স্লোয়ার আর বৈচিত্র্যময় বোলিং দিয়ে অভিষেকের পর থেকেই তিনি জায়গা করে নেন বিশ্ব ক্রিকেটে। আজ ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর ৩১তম জন্মদিন। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর পেরিয়ে গেছে এক দশকেরও বেশি সময়। এই সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারে জমেছে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক মোস্তাফিজের ক্যারিয়ারের আলোচিত ১০টি অধ্যায়।
২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় মোস্তাফিজের। প্রথম ম্যাচেই তাঁর শিকার হন পাকিস্তানের তারকা শহীদ আফ্রিদি। পরে মোহাম্মদ হাফিজকেও ফিরিয়ে দেন তিনি। চার ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়ে নেন দুটি উইকেট। অভিষেকেই নিজের আগমনী বার্তা দেন কাটার মাস্টার।
টি-টোয়েন্টি অভিষেকের কিছুদিন পর ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডেতে অভিষেক হয় মোস্তাফিজের। ২০১৫ সালের ১৮ জুন প্রথম ওয়ানডেতেই রোহিত শর্মা ও আজিঙ্কা রাহানেকে আউট করেন। পরে সুরেশ রায়না, রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজার উইকেট নিয়ে পূর্ণ করেন পাঁচ উইকেট। ৫০ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরাও হন তিনি।
ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে মোস্তাফিজ নেন ছয় উইকেট। প্রথম দুই ম্যাচেই তাঁর শিকার ১১ উইকেট। সিরিজের শেষ ম্যাচে আরও দুটি উইকেট নিয়ে তিন ম্যাচে মোট ১৩ উইকেট পান। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক সিরিজেই এমন পারফরম্যান্স তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের আলোচনায় নিয়ে আসে। তাঁর প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নেওয়া এখনও অভিষেকের অসাধারণ রেকর্ডগুলোর একটি।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন মোস্তাফিজ। প্রথম ১৩ ওভারে কোনো উইকেট না পেলেও ১৪তম ওভারে বদলে যায় পুরো দৃশ্য। ওই ওভারে হাশিম আমলা, জেপি ডুমিনি ও কুইন্টন ডি ককের উইকেট তুলে নেন তিনি। বৃষ্টির কারণে ম্যাচ ড্র হলেও দুর্দান্ত বোলিংয়ের জন্য ম্যাচসেরার পুরস্কার পান।
২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মোস্তাফিজের বোলিং ছিল দুর্দান্ত। মাত্র ২২ রান দিয়ে নেন পাঁচ উইকেট। তাঁর শিকারদের মধ্যে ছিলেন কেন উইলিয়ামসনও। বৈচিত্র্যময় বোলিংয়ে বিশ্বকাপেও নিজের সামর্থ্যের জানান দেন তিনি।
২০১৬ সালে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে আইপিএলে অভিষেক হয় মোস্তাফিজের। প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর এবি ডি ভিলিয়ার্স ও শেন ওয়াটসনের উইকেট নেন তিনি। চার ওভারে ২৬ রান দিয়ে দুই উইকেট নিয়ে শুরু করেন আইপিএল অভিযান।
প্রথম আইপিএল মৌসুমেই মোস্তাফিজ হয়ে ওঠেন হায়দরাবাদের গুরুত্বপূর্ণ বোলার। ১৬ ম্যাচে ১৭ উইকেট নিয়ে দলকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে পান ‘সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়’-এর পুরস্কার। আইপিএলের ইতিহাসে প্রথম বিদেশি ক্রিকেটার হিসেবে এই পুরস্কার জেতেন তিনি।
মোস্তাফিজের আইপিএল ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য ছিল কলকাতা নাইট রাইডার্সের আন্দ্রে রাসেলের বিপক্ষে তাঁর বোলিং। নিখুঁত ইয়র্কারে রাসেলকে বোল্ড করেন মোস্তাফিজ। উইকেট হারানোর পর রাসেলের পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটিও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন জায়গা করে নেয়।
২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে নেমেই বড় প্রভাব ফেলেন মোস্তাফিজ। আট ম্যাচে তাঁর ঝুলিতে জমে ২০ উইকেট। ভারত ও পাকিস্তানের বিপক্ষেও নেন পাঁচটি করে উইকেট। পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারিদের তালিকায় চতুর্থ ছিলেন তিনি।
২০২৪ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে হিউস্টনে সিরিজের তৃতীয় টি-টোয়েন্টিতে ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বোলিং করেন মোস্তাফিজ। চার ওভারে মাত্র ১০ রান দিয়ে নেন ছয় উইকেট। এটিই ছিল টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোনো বাংলাদেশি বোলারের প্রথম ছয় উইকেটের কীর্তি। একই সঙ্গে ৬/১০ হয়ে যায় তাঁর ক্যারিয়ারসেরা টি-টোয়েন্টি বোলিং।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখার পর থেকেই মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের অন্যতম পরিচিত মুখ। অভিষেকের বিস্ময়, আইপিএলের সাফল্য, বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স কিংবা টি-টোয়েন্টিতে ৬/১০—প্রতিটি অধ্যায়েই রয়েছে তাঁর আলাদা ছাপ।
৩১তম জন্মদিনে বাংলাদেশের এই তারকা পেসারের জন্য রইল শুভকামনা—আরও দীর্ঘ হোক তাঁর ক্রিকেটযাত্রা, সমৃদ্ধ হোক তাঁর রেকর্ডের খাতা।