যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আদেশনামা’ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও লেখক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর দাবি, এ চুক্তির মাধ্যমে দেশের স্বার্থ ও জনগণের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কে আয়োজিত এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আনু মুহাম্মদ। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে এ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া চুক্তিটি প্রকৃত অর্থে কোনো চুক্তি নয়, বরং এটি ট্রাম্পের আদেশনামার মতো। তাঁর মতে, গণতন্ত্রের অর্থ শুধু ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং সেই সিদ্ধান্তের ওপর জনগণের কতটা কর্তৃত্ব রয়েছে, সেটিই গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু দেশের মানুষ এখনো সেই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা চলছে: আনু মুহাম্মদ
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমালোচনা করে আনু মুহাম্মদ বলেন, ব্রিটিশ শাসকেরা নিজেদের শাসন ও শোষণ দীর্ঘস্থায়ী করতে একসময় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করত। তাঁর অভিযোগ, বর্তমান সরকারও দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে কৃত্রিম বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, জনগণ সরকারকে ক্ষমতায় আনেনি; বরং ট্রাম্পই তাঁদের সরকারে বসিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত দেশে কীভাবে জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে, তা সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, এসব বিষয়ে নীরব দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না। জনগণের স্বার্থবিরোধী বলে বিবেচিত চুক্তি থেকে সরকারকে সরে আসতে বাধ্য করতে জনসাধারণকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ
সমাবেশে গবেষক মাহতাব উদ্দীন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, চুক্তিটি বহাল থাকলে দেশের বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর ফলে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রসঙ্গে মাহতাব উদ্দীন আহমেদ বলেন, এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ শর্ত ও চুক্তি প্রকাশ করা হয়নি। তাঁর অভিযোগ, সরকার এ ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণই যখন বড় চ্যালেঞ্জ, তখন সরকার একের পর এক কেনাকাটা ও চুক্তির মাধ্যমে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে।
গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতনও সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন পূরণের পরিবর্তে বিদেশি শক্তিকে সন্তুষ্ট করাই সরকারের মূল নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন চিকিৎসক হারুন অর রশিদ, বাহাদুর শাহ পার্কের ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংগ্রাম পরিষদের সদস্যসচিব আখতারুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মানস নন্দী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের নেতা ইভান তাহসীব।
সমাবেশ শেষে আয়োজকদের উদ্যোগে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি বাহাদুর শাহ পার্ক ও আশপাশের সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে অংশগ্রহণকারীরা মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
সূত্র: সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য ও আয়োজকদের বিবরণ।