বর্ষার পানিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বগুড়ার বাঙ্গালী নদী। নদীর পানিতে রঙিন নৌকার ছুটে চলা, ঢাকের বাদ্য আর সারিগানের সুরে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে নদীর দুই পাড়। নৌকাবাইচ দেখতে ভিড় করছেন আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের হাজারো মানুষ।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের চোমর পাথালিয়া ও সুঘাট এলাকায় বাঙ্গালী নদীতে আয়োজন করা হয়েছে এই নৌকাবাইচের। প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।
নদীর বুকে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলো এগিয়ে যাচ্ছে মাঝিমাল্লাদের ছন্দময় বৈঠার টানে। নৌকার সামনে ঢাক বাজানোর পাশাপাশি গায়েনদের সারিগানের সুর পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলছে। দুই তীরে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা হাততালি ও উচ্ছ্বাসের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের উৎসাহ দিচ্ছেন।
নৌকাবাইচ ঘিরে বসেছে মেলা
শুধু নৌকাবাইচ নয়, এই আয়োজনকে ঘিরে নদীর পাড়ে বসেছে বড় ধরনের গ্রামীণ মেলা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, মেলায় প্রায় ৪০০টি দোকান বসেছে।
মেলায় শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে নাগরদোলা ও বিভিন্ন ধরনের খেলনা। পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে খাবার, মিষ্টি, কাঠের আসবাবসহ নানা ধরনের পণ্য।
প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে। আর বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে নৌকাবাইচ। গত শুক্রবার এই আয়োজনের উদ্বোধন করা হয়েছে। আগামী বুধবার পর্যন্ত নৌকাবাইচ ও মেলা চলার কথা রয়েছে।
কয়েক দশকের ঐতিহ্য
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাঙ্গালী নদীতে নৌকাবাইচ আয়োজনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। বর্ষার পানি কমতে শুরু করলে প্রতিবছর বিভিন্ন এলাকার মানুষ মিলে এ ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন।
সুঘাট, চোমর পাথালিয়া, কল্যাণী, ঝাঁজর, বড়ইতলীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নৌকাবাইচ হয়ে আসছে। এতে আশপাশের ছয়-সাতটি গ্রামের মানুষ যুক্ত হন।
আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ জানান, প্রায় তিন দশক ধরে তাঁরা এই আয়োজন করে আসছেন। এবার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে ১৩টি নৌকা।
তিনি বলেন, প্রতিযোগিতায় বিজয়ী প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী নৌকার পাশাপাশি অংশগ্রহণকারী অন্যান্য নৌকার প্রতিযোগীদেরও সম্মাননা দেওয়া হবে।
দূরদূরান্ত থেকেও দর্শনার্থী
নৌকাবাইচ দেখতে শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ আসছেন।
সুঘাট ইউনিয়নের খিদির হাসরা গ্রামের ঝরনা রানী ও রেখা রানী প্রতিবছর নৌকাবাইচ দেখতে আসেন। এবারও তাঁরা প্রায় দুই মাইল পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিযোগিতা দেখতে এসেছেন। নৌকাবাইচ উপভোগের পাশাপাশি মেলা থেকে মিষ্টিও কিনেছেন তাঁরা।
স্থানীয় দর্শনার্থীদের ভাষ্য, নৌকার প্রতিযোগিতা, ঢাকের শব্দ ও সারিগানের সুর মিলিয়ে এ আয়োজন গ্রামের মানুষের জন্য আনন্দের বড় উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তায় পুলিশের পাশাপাশি আয়োজকেরাও
মেলা ও নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের পাশাপাশি আয়োজক কমিটির প্রায় ১০০ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন।
এবারের প্রতিযোগিতায় বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকা এসেছে।
শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এস এম মঈনুদ্দীন জানান, মেলা ও নৌকাবাইচ যাতে নির্বিঘ্নে শেষ হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আয়োজন শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
নৌকাবাইচকে ঘিরে বাঙ্গালী নদীর দুই পাড়ের এই উৎসব এখন শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি প্রাণবন্ত অংশ হিসেবে মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।