শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩

আপনি পড়ছেন : বিশ্ব

ত্রিশূলী বাজারে গিয়ে যা দেখলেন বাংলাদেশের ত্রাণকর্মী


Rabeya ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকাল ৩:০১



ত্রিশূলী বাজারে গিয়ে যা দেখলেন বাংলাদেশের ত্রাণকর্মী


বিদুরে পৌঁছানোর পর আমাদের গাড়ি থেমে গেল। সামনে যাওয়ার মতো রাস্তা নেই। মহাসড়কের একটি বড় অংশই ত্রিশূলী নদীর স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে।

নেপালের নুয়াকোট জেলার বিদুর শহরটি কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে। এখানকার নেপাল সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রকে ঘিরে চলছে উদ্ধার কার্যক্রম। সেখানে গড়ে উঠেছে ফিল্ড ক্যাম্প। কিছুক্ষণ পরপর হেলিকপ্টার আসছে, আবার উড়েও যাচ্ছে। কেউ নিয়ে যাচ্ছে ত্রাণ, কেউ ফিরছে আহত, অসুস্থ কিংবা মৃত মানুষ নিয়ে।

৩০ আগস্ট সেখানে পৌঁছে গাড়ি রেখে পায়ে হাঁটা শুরু করি। সামনে ত্রিশূলী বাজার। পাহাড়ের গা ঘেঁষে যতই এগোচ্ছি, ততই চোখে পড়ছে বন্যার ভয়াবহ চিহ্ন।

ত্রিশূলী নদীর দুই পাড়জুড়ে শুধু ধ্বংস আর ধ্বংস। পথে যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাঁদের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। ঘটনার আকস্মিকতা যেন এখনো তাঁদের মন থেকে কাটেনি।

প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পর আর এগোনো সম্ভব হলো না। সেটিই ছিল ত্রিশূলী বাজার। একসময় যেখানে মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল বাজার, সেখানে এখন তাকালে চেনাই কঠিন।

কাদার মধ্যে অর্ধেক ডুবে আছে একটি পিকআপ। পাশেই কাদায় চাপা পড়ে থাকা একটি মোটরসাইকেলের শুধু হেডলাইট দেখা যাচ্ছে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে বিদ্যুতের তার। কোনো ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, কোনো ভবনের ছাদ পর্যন্ত কাদা জমে আছে। ভবনের ভেতর ঢুকে গেছে গাছের ডাল ও লতাগুল্ম।

দৃশ্যগুলোই বলে দিচ্ছিল, কতটা ভয়ংকর গতিতে কাদা, বালু আর পাথর মেশানো পানি ছুটে এসেছিল।

বাজারজুড়ে বাতাসে তীব্র দুর্গন্ধ। মাস্ক সরানোর উপায় নেই। সেই গন্ধ যেন জানান দিচ্ছিল, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো কত মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে।

বাজারের একটি ব্যাংক ভবনও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, দুর্যোগের সময় ব্যাংকটিতে ২৩ জন কর্মী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র তিনজন বেঁচে ফিরেছেন। বাকি ২০ জনের কোনো সন্ধান তখনো পাওয়া যায়নি।

পুরো এলাকায় কোথাও কোথাও কয়েক ফুট গভীর কাদা জমে আছে। সেখানে পা ফেললেই শরীর দেবে যাওয়ার আশঙ্কা। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যেই উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নেপালের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। তাঁরা ঘটনাস্থলে আসা মানুষজনকেও সতর্ক করছেন।

এরই মধ্যে পাশ দিয়ে শান্তভাবেই বয়ে যাচ্ছিল ত্রিশূলী নদী। অথচ ২৬ আগস্ট মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে এই নদীই নিয়েছিল ভয়ংকর রূপ। প্রবল স্রোত কাদা, বালু ও ধ্বংসাবশেষ নিয়ে ছুটে এসে মানুষের বসতি তছনছ করে দেয়।

কেউ শেষ মুহূর্তে নিরাপদ জায়গায় সরে গিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন, আবার কেউ স্রোতের সঙ্গে ভেসে গেছেন বা মাটির নিচে চাপা পড়েছেন।

বন্যার পর কয়েক দিন এসব এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে ধীরে ধীরে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কেউ হারিয়েছেন স্বজন, কেউ এখনো নিখোঁজ আপনজনের অপেক্ষায়। অনেকের চাওয়া এখন একটাই—প্রিয়জনের মরদেহ হলেও যেন খুঁজে পাওয়া যায়।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, অনেক মানুষই ঘটনাস্থল থেকে খুব বেশি দূরে সরে যাননি। নিজেদের বিধ্বস্ত বাড়ির আশপাশেই তাঁরা ঘুরছেন। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খুঁজছেন প্রিয় মানুষটির কোনো চিহ্ন।

দৃশ্যগুলো সত্যিই মন ভার করে দেওয়ার মতো।

চিকিৎসার পরিকল্পনা বদলে গেল

ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতাল ট্রাস্টের উদ্যোগে কমিউনিটি ইনিশিয়েটিভ সোসাইটি বাংলাদেশের (সিআইএস) হয়ে আমরা চারজন নেপালে এসেছি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কাজ করা জাপানভিত্তিক এশিয়া প্যাসিফিক অ্যালায়েন্স ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সদস্য সিআইএস। জোটের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে নেপালে কাজ চলছে। সহযোগিতা করছে নেপাল মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ও নেপাল স্টুডেন্ট ইউনিয়ন।

কাঠমান্ডুতে প্রথম বৈঠকের সময় পরিকল্পনা ছিল দুর্গত এলাকায় চিকিৎসাসেবা দেওয়ার। ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বিদুর ও ত্রিশূলী বাজারের পরিস্থিতি দেখে পরিকল্পনা পাল্টাতে হয়। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গুরুতর আহত মানুষের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। যাঁদের চিকিৎসা প্রয়োজন ছিল, তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন। খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

বরং তখন দুর্গত মানুষের প্রয়োজন ছিল দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রী—সোলার লাইট, পোশাক, এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারসহ নানা উপকরণ।

তাই আবার কাঠমান্ডুর দিকে ফিরতে হয়। দুর্গত এলাকায় পৌঁছানোর জন্য যানবাহন পাওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক চালক একবার যাওয়ার পর আর সেখানে যেতে চাইছিলেন না।

শেষ পর্যন্ত নেপালের কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেলের পরামর্শ নিয়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওষুধের একটি অংশ নেপাল সেনাবাহিনীর কাছেও তুলে দেওয়া হয়।

দেবীঘাটে ধ্বংসস্তূপের মাঝে মানুষের পাশে

১ সেপ্টেম্বর একটি দল নিয়ে দেবীঘাটের দিকে যাত্রা করি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এর আগেই দেখেছিলাম, কী ভয়াবহ ধ্বংস নেমে এসেছে সেখানে।

অনেক মানুষ শ্রীচন্দ্রজ্যোতি স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলি। শিশুদের জন্য কাপড়, তোয়ালে, চকলেট, সাবানসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও হাইজিন সামগ্রী দেওয়া হয়।

দেবীঘাটের একটি মসজিদ নিয়েও বাংলাদেশে আলোচনা হয়েছিল। সেখানে গিয়ে মসজিদের ইমাম জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা বলি।

মসজিদের কাছাকাছি পাশাপাশি কয়েক সারিতে বাড়িঘর ছিল। নদীর দিকে থাকা প্রথম সারির বাড়িগুলো প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

দুর্যোগের সময় মসজিদের ভেতর থেকেই সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। মসজিদের ভেতরেও পানি উঠেছিল। তাঁর নিজের বাড়ির অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সেই মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তখন তাঁর মনে হয়েছিল হয়তো আর বেঁচে ফেরা সম্ভব হবে না। চারদিকে ছিল প্রচণ্ড শব্দ। মাটি কাঁপছিল, ভবনগুলোতে ফাটল দেখা দিচ্ছিল। মসজিদটিও কেঁপে উঠেছিল।

তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছি। সাহস দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

দুর্যোগের পর সেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ মসজিদে আশ্রয় নিয়েছেন। টানা কয়েক দিন মসজিদ থেকেই পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে।

নিখোঁজ শত শত মানুষ, ভারী হয়ে উঠল মন

দেবীঘাট থেকে আবার বিদুরে ফিরে জেলা প্রশাসনের সমন্বয় কমিটির সঙ্গে কথা বলি। পরে বিস্তারিত তথ্য নিয়ে কাঠমান্ডুর পথে রওনা হই।

এদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও শ্রীলঙ্কার সদস্যদের নিয়ে যে দলটি রাসুয়া জেলায় গিয়েছিল, তারাও ফিরে আসে। তাঁদের অভিজ্ঞতা শুনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়।

দলটি রাসুয়ার নীলকণ্ঠ সেকেন্ডারি স্কুলেও গিয়েছিল। সেখানে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২০০ জন নিখোঁজ থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষকও নিখোঁজ।

শিক্ষার্থীদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে একটি বাসও বানের স্রোতে পড়েছিল। আবার যারা সেদিন স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে ছিল, তাদেরও কেউ কেউ হয়তো বন্যার ভয়াবহ স্রোত থেকে রক্ষা পায়নি। কারণ, কিছু এলাকায় বসতিই পুরোপুরি ভেসে গেছে।

বিদ্যালয় ভবনটি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে। স্কুলে পৌঁছাতে পেরেছিলেন এমন শিক্ষার্থীরাও বেঁচে গেছেন। তবে তাঁদের মধ্যে প্রায় ১২০ জনের মা-বাবার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

এই খবর শুনে মন আরও খারাপ হয়ে গেল।

প্রায় ৩০ বছর ধরে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দুর্যোগে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে টাঙ্গাইলের সখীপুরের ভয়াবহ টর্নেডো থেকে শুরু করে গত বছর শ্রীলঙ্কার আকস্মিক বন্যা—অনেক বিপর্যয়ের সাক্ষী হয়েছি। কিন্তু নেপালের এই দুর্যোগের অভিজ্ঞতা যেন অন্যরকম।

আর দুর্যোগের পর নেপালে আসতে চাই না

২০১৪ সালের ডিসেম্বরে পরিবার নিয়ে নেপালের ধুলিখেলে গিয়েছিলাম। তখন আমাদের সন্তান খুব ছোট। তীব্র ঠান্ডায় সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে আসতে হয়েছিল।

কে জানত, মাত্র কয়েক মাস পর আবার সেই নেপালেই ফিরতে হবে—তবে পর্যটক হিসেবে নয়, ভূমিকম্পের পর উদ্ধার ও মানবিক সহায়তার কাজে। সেই কাজে কেটে যাবে প্রায় চার মাস।

নেপালের পাহাড়, নদী আর মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তাই শুধু ভ্রমণের স্মৃতিতে আটকে নেই। এর সঙ্গে মিশে আছে দুর্যোগের কঠিন অভিজ্ঞতাও।

তবু আর এভাবে নেপালে আসতে চাই না।

কোনো দুর্যোগের পর নয়, কোনো ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে নয়—একদিন একজন সাধারণ পর্যটক হয়ে নেপালে ফিরতে চাই।

হাসিমুখে দেখতে চাই নেপালের পাহাড়, নদী আর মানুষকে।