সাদা রং, দুধের মতো ঘনত্ব কিংবা চর্বির মাত্রা—সবকিছুই যদি কৃত্রিমভাবে দুধের কাছাকাছি করা যায়, তাহলে শুধু চোখে দেখে আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা কঠিন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দুগ্ধ উৎপাদন অঞ্চল পাবনা ও সিরাজগঞ্জে নকল দুধ তৈরির একাধিক ঘটনায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় পানি, সোডা, সয়াবিন তেল, চিনি, লবণসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে দুধের মতো তরল তৈরির অভিযোগ উঠেছে। পাবনার চাটমোহরেও সম্প্রতি অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩০০ লিটার কৃত্রিম দুধ জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে দুধ তৈরির বিভিন্ন উপকরণও উদ্ধার করা হয় এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত একজনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেন।
এর আগে পাবনার অন্যান্য এলাকাতেও ভেজাল দুধ তৈরির অভিযোগে অভিযান ও শাস্তির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়, সমস্যাটি কোনো একটি বাড়ি, কারখানা বা এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা কঠিন।
তবে কয়েকটি ঘটনায় নকল দুধ ধরা পড়েছে বলেই পাবনা-সিরাজগঞ্জের সব দুধ বা সব খামারিকে সন্দেহ করা ঠিক হবে না। বরং অসাধু কয়েকজনের কর্মকাণ্ডের কারণে হাজারো সৎ খামারি এবং পুরো দুগ্ধশিল্পের ওপর আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
প্রাকৃতিক দুধে পানি, চর্বি, প্রোটিন, ল্যাকটোজ ও খনিজ উপাদান একটি নির্দিষ্ট ভারসাম্যে থাকে। কৃত্রিমভাবে দুধের মতো দেখতে তরল তৈরি করা গেলেও প্রাকৃতিক দুধের সেই স্বাভাবিক গঠন ও পুষ্টিমান তৈরি করা যায় না।
সমস্যা হলো, নকল দুধ তৈরির ক্ষেত্রে এমন কিছু উপাদান ব্যবহার করা হতে পারে, যা দুধের ঘনত্ব বা চর্বির মাত্রাকে স্বাভাবিকের কাছাকাছি দেখাতে পারে। ফলে শুধু রং, ঘনত্ব, ফেনা বা স্বাদ দেখে কোনো দুধকে নিশ্চিতভাবে আসল কিংবা নকল বলা নিরাপদ নয়।
দুধে পানি মেশানো হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ঘনত্ব, হিমাঙ্ক, চর্বি এবং চর্বিবিহীন কঠিন পদার্থসহ একাধিক সূচক বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে শ্বেতসার, ইউরিয়া, ক্ষারজাতীয় উপাদান, বহিরাগত চর্বি বা অন্যান্য অনাকাঙ্ক্ষিত পদার্থের উপস্থিতি যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা।
অর্থাৎ নকল বা ভেজাল দুধ শনাক্ত করার জন্য একটি মাত্র পরীক্ষাই সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় সন্দেহ তৈরি হলে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে আরও নির্ভুল পরীক্ষা করা জরুরি।
কোনো একটি স্থানে নকল দুধ পাওয়া গেলে শুধু সেই পণ্য জব্দ বা ধ্বংস করাই যথেষ্ট নয়। এরপর খুঁজে দেখা দরকার—দুধটি কার কাছ থেকে এসেছে, কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল এবং এর সঙ্গে আর কারা যুক্ত।
একজন ব্যক্তি যদি নিয়মিত নকল দুধ তৈরি করেন, তাহলে তার পণ্য বিক্রির একটি বাজার থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। তাই উৎপাদনস্থলের পাশাপাশি ক্রেতা, সংগ্রাহক, পরিবহনকারী ও সম্ভাব্য বাজারজাতকারীদের সম্পর্কেও অনুসন্ধান প্রয়োজন।
নকল দুধ খাঁটি দুধের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার। একইভাবে এই তরল কোনো মিষ্টির দোকান, ছানা বা দই তৈরির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।
কারণ শুধু একজন প্রস্তুতকারীকে শাস্তি দিলে সাময়িকভাবে একটি উৎপাদনকেন্দ্র বন্ধ হতে পারে। কিন্তু ক্রেতা ও সরবরাহের পথ অক্ষত থাকলে নতুন কেউ একই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পাবনার চাটমোহরে ৩০০ লিটার নকল দুধ জব্দ এবং একজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা দেখিয়েছে যে প্রশাসনের অভিযান গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। কোনো এলাকায় বারবার এমন ঘটনা পাওয়া গেলে সেখানে নিয়মিত এবং ঝুঁকিভিত্তিক নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দুগ্ধ উৎপাদন ও সংগ্রহ এলাকাতেও পর্যায়ক্রমে নমুনা পরীক্ষা করা দরকার। কোনো একটি অঞ্চলে ঘটনা পাওয়া গেলেই পুরো অঞ্চলকে সন্দেহের চোখে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি একটি এলাকায় সমস্যা নেই ধরে নিয়ে নজরদারি বন্ধ রাখাও উচিত নয়।
নকল দুধ প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, যেসব এলাকায় বারবার ভেজাল দুধের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে নিয়মিত ও আকস্মিক নমুনা সংগ্রহ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কোনো নমুনায় ভেজাল প্রমাণিত হলে তদন্ত শুধু উৎপাদনস্থলে সীমাবদ্ধ না রেখে দুধের উৎস ও গন্তব্য—দুই দিকেই চালাতে হবে।
তৃতীয়ত, দুধ সংগ্রহকেন্দ্রে শুধু চর্বি বা ঘনত্ব নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড পরীক্ষার সক্ষমতাও বাড়ানো দরকার।
চতুর্থত, একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার একই ধরনের অপরাধে জড়িত হলে বিদ্যমান আইনে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
নকল দুধের সবচেয়ে বড় ক্ষতির একটি দিক হলো—এর প্রভাব শুধু ভোক্তার ওপর পড়ে না, সৎ খামারিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কম খরচে তৈরি কৃত্রিম তরল বাজারে ঢুকে পড়লে প্রকৃত দুধ উৎপাদনকারী খামারিরা ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। একই সঙ্গে কোনো অঞ্চলের দুধ নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হলে সৎ উৎপাদকদের ব্যবসাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
তাই নকল দুধের বিরুদ্ধে অভিযানকে শুধু খাদ্যভেজালবিরোধী কার্যক্রম হিসেবে দেখলে হবে না। এটি ভোক্তার নিরাপত্তা, সৎ খামারির স্বার্থ এবং দেশের দুগ্ধশিল্পের প্রতি মানুষের আস্থা রক্ষার বিষয়ও।
দুধের রং, ঘনত্ব, ফেনা কিংবা স্বাদ দেখে সন্দেহ করা যেতে পারে; কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
আর পরীক্ষায় কোনো নমুনা ভেজাল প্রমাণিত হলে সেখানেই তদন্ত শেষ করা উচিত নয়। বরং সেই প্রমাণ ব্যবহার করে খুঁজে বের করতে হবে পুরো সরবরাহপথ—উৎপাদন থেকে সংগ্রহ, পরিবহন, মিশ্রণ এবং বাজারজাতকরণ পর্যন্ত।
একজন নকল দুধ প্রস্তুতকারীকে গ্রেপ্তার করলে হয়তো একটি কারবার সাময়িকভাবে বন্ধ হবে। কিন্তু তার ক্রেতা, বাজার ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে একই ধরনের ব্যবসা আবারও ফিরে আসতে পারে।
তাই নকল দুধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হলে শুধু কারখানায় অভিযান নয়, উৎস থেকে বাজার পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তবেই ভোক্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সৎ খামারি ও দেশের দুগ্ধশিল্পের প্রতি মানুষের আস্থাও ধরে রাখা সম্ভব হবে।