রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর গ্রামে এখন দাঁড়িয়ে আছে নতুন ইটের তৈরি তিনটি ঘর। পাকা রাস্তা, টিনের ছাউনি আর প্রশস্ত বারান্দা দেখে মনে হতে পারে, দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কিন্তু এই বাড়ির ভেতরে এখনও বাস করে গভীর শোক আর অপূরণীয় এক শূন্যতা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহত আবু সাঈদের স্মৃতি আজও আঁকড়ে ধরে আছেন তাঁর মা মনোয়ারা বেগম। ছেলের ব্যবহৃত জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে তিনি এখনও অশ্রু ঝরান। অন্যদিকে বাবা মকবুল হোসেন প্রায়ই ছেলের কবরের পাশে গিয়ে নীরবে বসে থাকেন।
বাড়ির পাশেই লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা আবু সাঈদের কবর। সেখানে দাঁড়িয়ে মকবুল হোসেন বলেন, এই জায়গায় তাঁর নিজের কবর হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেখানে শায়িত হয়েছেন তাঁর সন্তান।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন আবু সাঈদ। আন্দোলন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রূপ নিলে তিনি অন্যতম সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তাঁর মৃত্যু আন্দোলনে নতুন গতি এনে দেয় এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান আবু সাঈদ ছিলেন নয় ভাইবোনের মধ্যে একজন। পরিবারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের মেধার জোরে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ পরিবারের জন্য এককালীন ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের সহায়তায় পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। তবে স্বজন হারানোর কষ্ট কোনো সহায়তাই মুছে দিতে পারেনি।
মনোয়ারা বেগম বলেন, ছেলের কথা খুব মনে পড়লে তাঁর জামাকাপড় বুকে জড়িয়ে ধরেন। আবু সাঈদের বয়সী কাউকে দেখলেই নিজের ছেলের মুখ ভেসে ওঠে তাঁর চোখে। সেই দিনের স্মৃতি মনে করে তিনি জানান, প্রথমে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পান, পরে বাড়িতে আসে তাঁর নিথর দেহ।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদের সাজা ঘোষণা করেছে। তবে আবু সাঈদের বাবা মনে করেন, শুধু রায় নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই প্রকৃত বিচার নিশ্চিত করবে।
এদিকে আবু সাঈদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে তোরণ, জাদুঘর, স্মৃতিস্তম্ভ ও স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব প্রকল্পের কাজ শিগগিরই শুরু হবে।
দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কবর জিয়ারত, শোক র্যালি, পুষ্পস্তবক অর্পণ, স্মরণসভা, দোয়া ও মিলাদসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনে শহীদ পরিবারের সদস্যসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।