রাতের অন্ধকারে জার্মান সীমান্তের গ্লাইভিৎস শহরের একটি রেডিও স্টেশনে হামলা চালায় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি। তাদের পরনে ছিল পোলিশ বিদ্রোহীদের মতো পোশাক। স্টেশনে ঢুকে কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর পোলিশ ভাষায় একটি বার্তাও সম্প্রচার করা হয়—রেডিও কেন্দ্রটি নাকি পোলিশদের দখলে চলে গেছে।
বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারত, পোল্যান্ডই জার্মান ভূখণ্ডে হামলা করেছে। কিন্তু ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত সাজানো নাটক। হামলাকারীরা ছিলেন নাৎসি জার্মানির আধাসামরিক বাহিনী এসএসের সদস্য।
পোল্যান্ডকে আগ্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করে সামরিক অভিযান শুরুর জন্য একটি অজুহাত তৈরি করাই ছিল এই ঘটনার উদ্দেশ্য। আর এর কয়েক ঘণ্টা পরই সেই পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ শুরু হয়।
১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোরে জার্মান যুদ্ধজাহাজ ‘শ্লেসভিগ-হলস্টাইন’ ডানজিগের কাছে পোলিশ সামরিক ঘাঁটি ভেস্টারপ্লাটে গোলাবর্ষণ শুরু করে। একই সময়ে জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের ওপর স্থল ও আকাশপথেও হামলা চালায়।
এই আক্রমণের মধ্য দিয়েই ইউরোপে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অধ্যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছিল। ভূখণ্ড হারানো, সামরিক সক্ষমতার ওপর বিধিনিষেধ এবং বিপুল যুদ্ধক্ষতিপূরণের বোঝা জার্মান জনগণের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে।
অনেক জার্মান নাগরিক চুক্তিটিকে জাতীয় অপমান হিসেবে দেখতেন। এই ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার সুযোগ পান অ্যাডলফ হিটলার।
১৯১৯ সালে তিনি জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেন। পরের বছর দলটির নাম বদলে হয় ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি, যা পরে নাৎসি পার্টি নামে পরিচিত হয়। ভার্সাই চুক্তি বাতিল করাসহ জার্মানিকে আবার শক্তিশালী করার নানা প্রতিশ্রুতি দেন হিটলার।
১৯২১ সালে দলের নেতৃত্ব নেওয়ার পর তাঁর উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য, প্রচারকৌশল ও সাংগঠনিক দক্ষতায় নাৎসি পার্টির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।
১৯৩২ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়ে দলটি জার্মান পার্লামেন্টের বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এরপর ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে চ্যান্সেলর নিয়োগ করেন।
ক্ষমতায় বসেই হিটলার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে শুরু করেন। ১৯৩৩ সালের মার্চে এনাবলিং অ্যাক্ট পাস হওয়ার পর পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তাঁর হাতে চলে আসে। ১৯৩৪ সালে হিন্ডেনবার্গের মৃত্যুর পর চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা একত্র করে নিজেকে ‘ফুয়েরার’ ঘোষণা করেন তিনি।
নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পাওয়ার পর হিটলার জার্মানির সামরিক শক্তি ও ভূখণ্ড সম্প্রসারণে মনোযোগ দেন।
১৯৩৬ সালে তিনি রাইনল্যান্ডে আবার জার্মান সেনা পাঠান। ভার্সাই-পরবর্তী ব্যবস্থায় অঞ্চলটি সামরিকীকরণমুক্ত রাখার কথা থাকলেও ব্রিটেন ও ফ্রান্স তখন কার্যকর সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।
এরপর ১৯৩৮ সালে অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করেন হিটলার। একই বছর মিউনিখ চুক্তির পর চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড জার্মানির নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৯৩৯ সালের মার্চে চেকোস্লোভাকিয়ার বাকি অংশও জার্মান দখলে চলে যায়।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধ এড়াতে বারবার হিটলারকে ছাড় দেওয়ার যে নীতি অনুসরণ করেছিল, ইতিহাসে তা ‘তুষ্টনীতি’ নামে পরিচিত। কিন্তু এতে হিটলারের আগ্রাসন থামেনি; বরং তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়।
এরপর তাঁর নজর পড়ে পোল্যান্ডের দিকে।
ভার্সাই চুক্তির পর ডানজিগকে একটি স্বাধীন নগররাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে পোল্যান্ডকে বাল্টিক সাগরে যাওয়ার সুযোগ দিতে জার্মান ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি করিডর দেওয়া হয়। এতে জার্মানির পূর্ব প্রুশিয়া মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১৯৩৯ সালে হিটলার ডানজিগকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করার দাবি তোলেন। পাশাপাশি পোল্যান্ডের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পূর্ব প্রুশিয়ার সঙ্গে জার্মানির সরাসরি যোগাযোগের জন্য সড়ক ও রেলপথ নির্মাণের দাবিও জানান।
পোল্যান্ড এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে জার্মানি কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই পোল্যান্ডে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।
জার্মান বাহিনীর হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। বেসামরিক জনগণও ভয়াবহ নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন।
হিটলার আশা করেছিলেন, পোল্যান্ডে হামলার পরও ব্রিটেন ও ফ্রান্স সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না। কিন্তু তাঁর হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়।
দুই দেশই জার্মানিকে পোল্যান্ড থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য ultimatum দেয়। জার্মানি তাতে সাড়া না দেওয়ায় ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রথমে যুক্তরাজ্য এবং পরে ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তৃত রূপ নেয়।
তবে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও শুরুতে জার্মানির বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালাতে পারেনি ব্রিটেন ও ফ্রান্স। অন্যদিকে জার্মান বাহিনী দ্রুতগতিতে পোল্যান্ডের ভেতরে অগ্রসর হতে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির প্রধান মিত্র হয়ে ওঠে ইতালি ও জাপান। পরবর্তী সময়ে হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ অক্ষশক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়।
ইতালি ১৯৪০ সালে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। উত্তর আফ্রিকা ও বলকানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দেশটির বাহিনী যুদ্ধ করে। ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনীর ইতালি অভিযানের পর দেশটি আত্মসমর্পণ করে এবং পরে জার্মানির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটিতে জাপানের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে প্রবেশ করে। এর ফলে যুদ্ধের পরিধি ইউরোপ ছাড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৪১ সালের ২২ জুন হিটলার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বিশাল সামরিক অভিযান শুরু করেন। বিপুলসংখ্যক জার্মান সেনা তিনটি প্রধান বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়।
শুরুতে জার্মান বাহিনী দ্রুত সোভিয়েত ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত রেড আর্মির প্রবল প্রতিরোধের মুখে জার্মানির অগ্রযাত্রা থেমে যায়।
বিশেষ করে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ জার্মানির জন্য ভয়াবহ পরাজয় ডেকে আনে। প্রায় ছয় মাসের লড়াইয়ের পর ১৯৪৩ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে জার্মান বাহিনীর আত্মসমর্পণ শুরু হয়। ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিপুলসংখ্যক জার্মান সেনা আত্মসমর্পণ করেন।
স্তালিনগ্রাদের পরাজয় জার্মান বাহিনীর মনোবলে বড় আঘাত হানে এবং যুদ্ধের গতিপথ ধীরে ধীরে বদলে যায়।
১৯৪৪ সাল থেকে সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব দিক এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্ররা পশ্চিম দিক থেকে জার্মানির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষদিকে সোভিয়েত সেনারা বার্লিনে প্রবেশ করে। ৩০ এপ্রিল নিজের ভূগর্ভস্থ বাংকারে আত্মহত্যা করেন হিটলার।
এরপর কার্ল দনিৎসের নেতৃত্বাধীন জার্মান সরকার মিত্রবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পথে এগিয়ে যায়। ৭ মে ফ্রান্সের রেইমসে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করা হয়। পরদিন ইউরোপে জার্মানির সামরিক অভিযান বন্ধ হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুরোধে বার্লিনেও আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।
ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হলেও জাপান তখনও আত্মসমর্পণ করেনি। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে।
এই ভয়াবহ হামলার পর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। পরে ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটে।
১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫—ছয় বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যায়। সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষও প্রাণ হারান।
সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, জার্মানি, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। হলোকাস্টের মাধ্যমে ইহুদি জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত হয় ভয়াবহ গণহত্যা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু মানুষের মৃত্যু বা শহর ধ্বংসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির কাঠামোও আমূল পরিবর্তিত হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ, বিশ্বরাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয় এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী স্নায়ুযুদ্ধ।
অর্থাৎ ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোল্যান্ডে চালানো সেই আগ্রাসন শুধু একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছিল না—এটি শেষ পর্যন্ত গোটা বিশ্বকে এক নজিরবিহীন সংঘাতে টেনে নেয়।