মদিনার বনু সালামা গোত্রের প্রধান ছিলেন আমর ইবনুল জামুহ। তিনি ছিলেন প্রভাবশালী, দানশীল ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। তবে জন্মগতভাবে তাঁর একটি পা দুর্বল ছিল এবং তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটতেন।
তৎকালীন আরব সমাজে গোত্রপ্রধানদের বাড়িতে মূর্তি রাখার প্রচলন ছিল। আমর ইবনুল জামুহের বাড়িতেও কাঠের তৈরি ‘মানাত’ নামে একটি মূর্তি ছিল। তিনি নিয়মিত সেই মূর্তির পূজা করতেন।
মহানবী (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের আগেই তাঁর তিন ছেলে মুআজ, মুআউয়িজ ও খাল্লাদ এবং স্ত্রী হিন্দ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনাবাসীকে ইসলামের শিক্ষা দিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সাহাবি মুসআব ইবনে ওমাইরকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁর দাওয়াতের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ইসলামের আলোয় আসেন।
তবে গোত্রপ্রধান বাবার সামাজিক প্রভাব ও সম্ভাব্য ক্ষোভের কথা বিবেচনা করে তাঁরা বিষয়টি গোপন রাখেন। একই সঙ্গে তাঁরা চাইছিলেন, তাঁদের বাবাও যেন ইসলাম গ্রহণ করেন।
সরাসরি তাঁকে বোঝাতে না গিয়ে ছেলেরা এক অভিনব পদ্ধতি গ্রহণ করেন। এক রাতে তাঁরা গোপনে বাবার কাঠের মূর্তিটি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মহল্লার আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মূর্তিকে নির্ধারিত স্থানে না পেয়ে আমর ইবনুল জামুহ অস্থির হয়ে পড়েন। খোঁজাখুঁজির পর আবর্জনার স্তূপ থেকে মূর্তিটি উদ্ধার করেন। এরপর সেটি পরিষ্কার করে সুগন্ধি মাখিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দেন।
এভাবে কয়েক দিন চলার পর তিনি বিরক্ত হয়ে মূর্তির গলায় একটি তরবারি ঝুলিয়ে দেন। তিনি মূর্তিকে উদ্দেশ করে বলেন, যদি তার কোনো ক্ষমতা থাকে, তাহলে সে যেন ওই তরবারি দিয়ে নিজেকে রক্ষা করে।
পরদিন সকালে আবারও মূর্তিটি দেখতে না পেয়ে তিনি খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে বনু সালামার একটি পরিত্যক্ত নোংরা কুয়ার কাছে তিনি মূর্তিটিকে পড়ে থাকতে দেখেন। মূর্তিটির সঙ্গে একটি মৃত কুকুরও বাঁধা ছিল।
ঘটনাটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যে মূর্তি নিজের কোনো ক্ষতি থেকে নিজেকেই রক্ষা করতে পারে না, সেটি কীভাবে মানুষের উপকার বা ক্ষতি করতে পারে—এই উপলব্ধি তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
এরপর আমর ইবনুল জামুহ মূর্তিপূজার অসারতা উপলব্ধি করেন এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
এর প্রায় তিন বছর পর আসে ঐতিহাসিক ওহুদ যুদ্ধ। মদিনায় যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল। আমরের ছেলেরা তাঁর দুর্বল পায়ের কথা উল্লেখ করে তাঁকে যুদ্ধে না যাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ শারীরিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির জন্য যুদ্ধ থেকে অব্যাহতির সুযোগ ছিল।
কিন্তু আমর ইবনুল জামুহ এতে রাজি হননি। তিনি মহানবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে নিজের আকাঙ্ক্ষার কথা জানান। তাঁর প্রবল ইমানি উদ্দীপনা দেখে মহানবী (সা.) শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেন।
ওহুদের ময়দানে দুর্বল পা নিয়েই আমর ইবনুল জামুহ সাহসের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। তাঁর ছেলে খাল্লাদ (রা.)-ও একই যুদ্ধে লড়ছিলেন। একপর্যায়ে পিতা-পুত্র দুজনই শাহাদাতবরণ করেন।
যুদ্ধের পর মহানবী (সা.) আমরের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দেন বলে বর্ণনায় এসেছে। তাঁর দুর্বল পা নিয়েও জান্নাতে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার দৃশ্যের কথা উল্লেখ করে তাঁকে সান্ত্বনা ও সুসংবাদ দেওয়া হয়।
পরে মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে আমর ইবনুল জামুহকে তাঁর আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারামের সঙ্গে একই কবরে দাফন করা হয়।
আমর ইবনুল জামুহের জীবন থেকে ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা পাওয়া যায়—সত্য উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা নয়। একইভাবে শারীরিক সীমাবদ্ধতাও একজন মানুষের ইমান, আত্মত্যাগ ও আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়ার ইচ্ছাকে থামিয়ে দিতে পারে না।
তাঁর জীবনের ঘটনাগুলো দেখায়, আন্তরিক বিশ্বাস ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে মানুষের দুর্বলতাকেও শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।