ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোনো আবেগ বা রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, বরং আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
তিনি বলেন, বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। ভারত তাঁকে হস্তান্তর করলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রোববার (৮ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বিচারিক কার্যক্রমে শুদ্ধাচার’ শীর্ষক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভারতের আদালতে কোনো আইনি লড়াই করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিষয়টি ভারত সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ তাঁর প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। ভারত তাঁকে হস্তান্তর করলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারত সরকার শেখ হাসিনাকে বন্দি হিসেবে বিবেচনা না করে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে উল্লেখ করছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের দৃষ্টিতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাজাপ্রাপ্ত একজন অপরাধী। তাঁর ভাষ্য, দেশে প্রকাশ্য আদালতে বিচার সম্পন্ন হয়েছে। তাই অন্য পক্ষ তাঁকে কীভাবে বিবেচনা করছে, সেটি বাংলাদেশের অবস্থান নির্ধারণের বিষয় নয়।
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিচার বিভাগে দুর্নীতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, আর্থিক দুর্নীতির তুলনায় বিচার বিভাগে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ওই রায়ের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হওয়ার এবং ফ্যাসিবাদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তাঁর মতে, এটি আর্থিক দুর্নীতির নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির পরিণতি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বিচারিক পর্যালোচনার নামে ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রয়োগের বিষয়েও সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য, সরকার এমন বিচার বিভাগ গড়ে তুলতে চায়, যেখানে নিরপেক্ষভাবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে এবং সেই বিচার জনগণের কাছেও দৃশ্যমান হবে।
অনুষ্ঠানে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা নির্ভর করে বিচারকদের সততা ও নৈতিকতার ওপর। রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাবের বাইরে থেকে বিচারকেরা দায়িত্ব পালন করলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষা সহজ হয়।
তিনি আরও বলেন, বিচারিক শুদ্ধতা নিশ্চিত করা গেলে নির্বাহী ও আইন বিভাগে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি প্রতিরোধেও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে।
অতীতে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক প্রভাব একধরনের স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছিল উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি বিচারক ও প্রয়োজনীয় জনবল বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় এবং উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত দুটি অধ্যাদেশ নির্বাচিত সরকার বাতিল করায় যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কাটবে বলেও আশা প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপির জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়েগার।