জিপিএ-৫ পাওয়ার স্বপ্ন ছিল মিনহাজুল ইসলাম রোজানের। এইচএসসি পরীক্ষার আগে পড়াশোনা নিয়ে নিজের ওপরই বাড়তি চাপ তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিবারের কেউ জানতেন না, মিনহাজুলের শরীরে ডায়াবেটিসের মতো গুরুতর একটি সমস্যা আগে থেকেই ছিল।
পরীক্ষার শেষ দিকে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর একাধিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও শুরুতে তাঁর শারীরিক সমস্যার প্রকৃত কারণ শনাক্ত হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ। মানসিক চাপ, পরীক্ষার দুশ্চিন্তা কিংবা প্যানিক অ্যাটাক মনে করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে জানা যায়, তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে।
মিনহাজুল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি ভার্সনের শিক্ষার্থী ছিলেন। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এই শিক্ষার্থীর পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ভবিষ্যতে সেনা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্নও ছিল তাঁর।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ আগস্ট মিনহাজুল প্রথম শারীরিক দুর্বলতার কথা জানান। দীর্ঘদিন পরীক্ষার প্রস্তুতির কারণে রাত জাগার প্রভাব বলে প্রথমে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। এরপর বুকে ব্যথা ও দুর্বলতা বাড়লে তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কিন্তু চিকিৎসার সময় পরীক্ষার চাপ ও মানসিক উদ্বেগের বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পায় বলে দাবি পরিবারের। এক পর্যায়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শও দেওয়া হয়। কোথাও ডায়াবেটিসসহ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
১২ আগস্ট মিনহাজুলকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে স্যালাইন ও ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয় এবং প্যানিক অ্যাটাক হয়েছে বলে জানানো হয়। পরদিন অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
১৩ আগস্ট তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা ৩৮ মিলিমোল/লিটারে পৌঁছে যায় বলে পরিবার জানায়। তখনই প্রথম মা-বাবা জানতে পারেন, তাঁদের ছেলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন।
এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ১৭ আগস্ট তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে শারীরিক জটিলতার পাশাপাশি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণও ধরা পড়ে এবং অস্ত্রোপচার করা হয়। বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর প্রস্তুতিও নিয়েছিল পরিবার। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সুযোগ হয়নি।
২৩ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিনহাজুলের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও নিশ্চিত করা হয়েছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই মিনহাজুল পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তিনি। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) বিভিন্ন কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন।
এইচএসসি পরীক্ষার সময় ফলাফল নিয়ে নিজের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতেন মিনহাজুল। কোনো পরীক্ষা ভালো না হলে পরের পরীক্ষার প্রস্তুতির বদলে আগের প্রশ্ন নিয়েই চিন্তা করতেন। একপর্যায়ে জিপিএ-৫ না পাওয়ার আশঙ্কাও তাঁকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।
তাঁর মা ফাহমিদা আক্তার জানান, পরিবার থেকে কখনো জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়নি। বরং মিনহাজুল নিজেই নিজের জন্য কঠিন লক্ষ্য নির্ধারণ করতেন এবং বিভিন্ন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, তীব্র মানসিক ও শারীরিক চাপের সময় শরীরে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিসে ইনসুলিনের ঘাটতি গুরুতর হলে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এতে শরীরে পানিশূন্যতা, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ডায়াবেটিস হলেই সব সময় অতিরিক্ত পিপাসা, ঘন ঘন প্রস্রাব বা ওজন কমার মতো প্রচলিত লক্ষণ দেখা যাবে—এমন নয়। গুরুতর অবস্থায় শ্বাসকষ্ট, পেটব্যথা, বমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, ঝিমুনি বা আচরণে পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প বয়সীদের মধ্যেও ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। তাই কোনো কিশোর বা তরুণ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে শুধু মানসিক চাপ বা পরীক্ষার দুশ্চিন্তা ধরে না নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তে শর্করাসহ শারীরিক পরীক্ষা করানো জরুরি।
মিনহাজুলের বাবা সাজ্জাদুল মিরাজ বলেন, ছেলের অসুস্থতার প্রকৃত কারণ দ্রুত শনাক্ত হলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। একাধিক হাসপাতালে নেওয়ার পরও ডায়াবেটিসের বিষয়টি ধরা না পড়ায় চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ।
ছেলেকে বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। চিকিৎসার জন্য অর্থের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। কিন্তু ২৩ আগস্ট সকালে চিকিৎসকের কাছ থেকে ছেলের অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ার খবর পান তিনি। কিছুক্ষণ পরই মিনহাজুল মারা যান।
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন দেখেছিলেন মা-বাবা। সেই সন্তানকেই হারিয়ে এখন শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। মা ফাহমিদার আক্ষেপ—ছেলের পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে, এমনটা কখনো চাননি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছেলেকে হারিয়েই তাঁর পরিচয় সামনে এসেছে।