ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে নিরাপত্তা চাপে পড়েছে সৌদি আরব। হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসায় বিকল্প উৎস থেকে সামরিক সহায়তা পাওয়ার চেষ্টা করছে রিয়াদ।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, সৌদি আরব ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছে। হুতি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা ঠেকাতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের প্রধান সামরিক মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে ওয়াশিংটনের নিজেদেরও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার মজুত কমে আসছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে অন্য মিত্রদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টা করছে রিয়াদ।
সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাব সৌদি আরব ও হুতিদের সম্পর্কেও পড়েছে। সম্প্রতি সৌদি আরব অভিযোগ করেছে, হুতিরা পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে একটি ড্রোন পাঠিয়েছিল। সৌদি কর্তৃপক্ষ সেটি ভূপাতিত করার দাবি করেছে।
রিয়াদ সতর্ক করে বলেছে, পবিত্র নগরীকে লক্ষ্য করে এ ধরনের কোনো হামলার চেষ্টা গুরুতর সীমালঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তারা পিছপা হবে না।
তবে হুতিরা মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের আকাশে একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে তারা। এ দাবির পক্ষে যুদ্ধবিমানটির ধ্বংসাবশেষের ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের জন্য হুতিদের হামলার কারণে শুধু সামরিক স্থাপনা রক্ষা নয়, তেল অবকাঠামো নিরাপদ রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি একটি হামলার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানা গেছে। এর পেছনে ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হচ্ছে। পাইপলাইনটি কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এর পাশাপাশি হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবিও করেছে হুতিরা। প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের জন্য বাব আল-মানদেব হয়ে তেল পরিবহনের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা বলেছেন, সৌদি আরব এখন অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। কারণ, দেশটির সামরিক ঘাঁটি ও সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি বিস্তীর্ণ অঞ্চলে থাকা তেলক্ষেত্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও নিরাপদ রাখতে হচ্ছে।
আরেক কর্মকর্তা জানান, হুতিদের মোকাবিলায় সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে রিয়াদ। ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ওমান ও মিসরও কূটনৈতিক ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে বলে তিনি জানান।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের মতে, বিষয়টি শুধু সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো নিরাপদ রাখার বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত।
এদিকে ওমানের রাজধানী মাসকাটে সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে হুতি প্রতিনিধিদের সরাসরি আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেলেও এর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি আরব সামরিক সহায়তা চাইলেও মিত্র দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সহযোগিতার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র টম ওয়েলস সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের কথা উল্লেখ করলেও রিয়াদ সামরিক সহায়তা চেয়েছে কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেননি। সৌদি ভূখণ্ডে ব্রিটিশ সেনা মোতায়েন রয়েছে কি না, সেটিও তিনি নিশ্চিত করেননি।
ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেরাই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থার ঘাটতির মুখে থাকায় সৌদি আরবকে বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তুরস্কও ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করছে বলে দেশটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
পাকিস্তান ও তুরস্ক সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যা ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত। তবে পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হুতিদের মোকাবিলায় সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাঁদের কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তার অনুরোধ আসেনি।
মক্কাকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরবের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও এ ঘটনায় সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
সৌদি আরবকে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের বক্তব্যে সৌদি-হুতি সংঘাতে সরাসরি জড়িয়ে পড়ার আগ্রহ স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে হুতিদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনা করেছে বলে তিনি জানান।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক পরিকল্পনায় সহযোগিতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে জার্মানিতে কয়েকটি দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকও হয়েছে।
তবে ওই বৈঠকে অংশ নেওয়া দেশগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীন সফরে গেছেন। ইরানের অন্যতম বড় জ্বালানি তেল ক্রেতা চীনের সঙ্গে চলমান আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় চীন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
অন্যদিকে আরাগচি বলেছেন, তেহরান এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী।
সব মিলিয়ে হুতি হামলা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে অস্থিরতা এবং তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা—তিন দিক থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদ এখন সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।