শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬
৭ ভাদ্র ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪: উচ্চমান সহকারী হারুন ইসলামকে ঘিরে ঘুষ ও সম্পদের অভিযোগ

>> সড়কে স্লিপার কোচ: অনুমোদন, নিরাপত্তা ও আমদানি নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন

>> বঙ্গবন্ধুর আদর্শে দেশ ও সমাজ গঠনে কাজ করছেন আয়মান হোসেন অপু

>> সিলেটে প্রদীপের ওপর ছাত্রদলের হামলার অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতায় সংখ্যালঘু পরিবার

>> ভয়াল ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ২২তম বার্ষিকী, আজও অম্লান শহীদদের স্মৃতি

>> ধানমন্ডি ৩২ ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ: ড. ইউনূস-আসিফ নজরুলসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

>> রাজউকের পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

>> রবার্তো কার্লোস ইসলাম গ্রহণ করেছেন? তুরস্কের সংবাদমাধ্যমের দাবি

>> কলকাতার হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু

>> দীপু মনির প্যারোলে মুক্তির পর স্বামীর জানাজার বিষয়ে সিদ্ধান্ত

আপনি পড়ছেন : এক্সক্লুসিভ

বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪: উচ্চমান সহকারী হারুন ইসলামকে ঘিরে ঘুষ ও সম্পদের অভিযোগ


২২ আগস্ট ২০২৬, বিকাল ৩:৫৫



বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো-৪: উচ্চমান সহকারী হারুন ইসলামকে ঘিরে ঘুষ ও সম্পদের অভিযোগ

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ—বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে সাধারণ মানুষের যানবাহন-সংক্রান্ত সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানি ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ নতুন নয়। লাইসেন্স, গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস, মালিকানা পরিবর্তনসহ নানা সেবা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা কিংবা দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার নামে দালালের শরণাপন্ন হওয়ার অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে। সাম্প্রতিক সময়েও রাজধানীর বিআরটিএ কার্যালয়গুলোতে দালালবিরোধী অভিযান হয়েছে।

এরই মধ্যে বিআরটিএর ঢাকা মেট্রো-৪ সার্কেলের উচ্চমান সহকারী হিসেবে কর্মরত হারুন ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, গ্রাহক হয়রানি, দালালদের মাধ্যমে কাজ পরিচালনা এবং সম্পদের অসঙ্গতি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো কোনো আদালত বা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের সূত্রপাত কোথায়?

অভিযোগকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বিআরটিএর বিভিন্ন সেবা নিতে আসা মানুষকে নিয়মিত প্রক্রিয়ায় কাজ সম্পন্ন করার পরিবর্তে দালালদের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু সেবার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হারুন ইসলাম এর আগে বিআরটিএর অন্য কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করার সময়ও গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি এবং অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি, সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং দায়িত্ব পালনের সময়কার প্রশাসনিক রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ কী?

অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিআরটিএতে সাধারণ নিয়মে একটি কাজ সম্পন্ন করতে যেখানে নির্দিষ্ট সরকারি ফি দেওয়ার কথা, সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে গাড়ির কাগজপত্র, নিবন্ধন, ফিটনেস কিংবা অন্যান্য সেবা দ্রুত পাওয়ার জন্য দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তা শুধু একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয় নয়; বরং সরকারি সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বড় প্রশ্ন তৈরি করে।

কারণ একজন সাধারণ নাগরিক যদি নিজের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে সরকারি অফিসে গিয়ে নির্ধারিত ফি দিয়েও সেবা না পান এবং অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া কাজ এগোয় না—তাহলে পুরো সেবা ব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থা কমে যায়।

দালাল চক্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

বিআরটিএর বিভিন্ন কার্যালয়ে দালালদের তৎপরতা ঠেকাতে কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অভিযান চালাতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক এক অভিযানে রাজধানীর মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয় থেকে পাঁচজন দালালকে কারাদণ্ড এবং কয়েকজনকে জরিমানা করা হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, দ্রুত কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এসব ব্যক্তি গ্রাহকদের কাছ থেকে কাগজপত্র ও অর্থ নিতেন।

আরেকটি অভিযানে বিআরটিএ কার্যালয় থেকে দুই দালালকে আটক করে কারাদণ্ড দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—দালালরা যদি কোনো সরকারি অফিসে নিয়মিতভাবে সক্রিয় থাকে, তাহলে তারা কার সহযোগিতায় বা কীভাবে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনা করছে?

অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না; তাদের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন

হারুন ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা কথিত সম্পদের উৎস।

অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর আয় ও চাকরির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে কিছু সম্পদের মালিকানা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

তবে কারও সম্পদের পরিমাণ বা সম্পদ অর্জনের বিষয়টি শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে অবৈধ বলে ধরে নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে তাঁর বৈধ আয়, বেতন, পারিবারিক সম্পদ, উত্তরাধিকার, ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী এবং ক্রয়-বিক্রয়ের দলিল পরীক্ষা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

কী ধরনের তদন্ত প্রয়োজন?

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

প্রথমত, সংশ্লিষ্ট সময়ে হারুন ইসলামের দায়িত্ব ও পদায়নের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে যেসব সেবা বা ফাইল তাঁর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে, সেগুলোর একটি নমুনা পরীক্ষা করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, নির্ধারিত সরকারি ফি এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক পার্থক্য ছিল কি না, তা যাচাই করা যেতে পারে।

চতুর্থত, তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগকারী ব্যক্তি বা দালালদের ভূমিকা তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, অভিযোগে যেসব সম্পদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর মালিকানা ও অর্থের উৎস যাচাই করা যেতে পারে।

আগের কর্মস্থল নিয়েও অভিযোগ

অভিযোগপত্রে হারুন ইসলামের আগের কর্মস্থল নিয়েও বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং দালালের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

এমনকি কোনো কোনো ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ নেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভুক্তভোগী, লেনদেনের প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ফাইল এবং অফিসিয়াল রেকর্ড যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অভিযোগ এবং প্রমাণিত অনিয়ম—দুটি এক বিষয় নয়।

সরকারি সেবায় কেন এমন অভিযোগ বারবার?

বিআরটিএ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসেবা প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে গাড়ি নিবন্ধন, ফিটনেস, লাইসেন্সসহ নানা কাজে আসেন।

একজন নাগরিক যদি সরাসরি কাউন্টারে গিয়ে নির্ধারিত নিয়মে সেবা পাওয়ার পরিবর্তে দালালের কাছে যেতে বাধ্য হন, তাহলে সেখানে সেবার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিআরটিএর নামে ভুয়া ওয়েবসাইট ব্যবহার করে মানুষকে প্রতারণার ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, বিআরটিএর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণা ও অনিয়ম ঠেকাতে শক্তিশালী নজরদারি প্রয়োজন।

অভিযোগ প্রমাণিত হলে কী হতে পারে?

তদন্তে যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা দালালদের সঙ্গে যোগসাজশের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইন ও সরকারি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিরও দায়মুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কারণ একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত কাউকে হয়রানি করা নয়; বরং সত্য বের করে আনা।

বিআরটিএতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উপায় কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি সেবা ব্যবস্থাকে দালালমুক্ত করতে হলে শুধু মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়।

প্রতিটি সেবার সরকারি ফি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন, অনলাইন আবেদন ও পেমেন্ট ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ফাইলের অগ্রগতি অনলাইনে দেখার সুযোগ তৈরি এবং কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর কাছে সরাসরি অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

একই সঙ্গে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি নজরদারি, অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং সেবাগ্রহীতাদের নিয়মিত মতামত নেওয়া যেতে পারে।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা

বিআরটিএতে সেবা নিতে আসা একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—তিনি যেন কোনো অতিরিক্ত অর্থ বা দালালের সহায়তা ছাড়াই বৈধ সেবা পেতে পারেন।

একই সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে সেটির দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃশ্যমান তদন্ত চান সাধারণ মানুষ।

হারুন ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রেও এখন মূল প্রশ্ন হলো—অভিযোগগুলো কতটা সত্য?

সেটির উত্তর দিতে প্রয়োজন নথি যাচাই, সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ এবং আর্থিক তথ্যের নিরপেক্ষ পর্যালোচনা।


বিআরটিএর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ঘুষ বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। আবার তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও ঠিক নয়।

তাই হারুন ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা হলে প্রকৃত সত্য সামনে আসতে পারে। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির সুনাম ও অধিকার রক্ষা—দুই বিষয়ই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।