বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩

সদ্যপ্রাপ্ত

>> হাসান মাহমুদকে পেছনে ফেলে আইসিসির আগস্টের মাসসেরা দিনুশা

>> ময়মনসিংহ মেডিকেলে অগ্নিকাণ্ড: বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ দাবি

>> হুতিদের ঠেকাতে মিত্রদের কাছে সামরিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

>> শত বছরের পশ্চিম বাজার, হাট থেকে রেমিট্যান্সনির্ভর বাণিজ্যকেন্দ্র

>> চুক্তির মাধ্যমে চার বন্ধ পাটকল চালু করল আবুল খায়ের গ্রুপ

>> হ্যাটট্রিকের কথা ভুলে গিয়েছিলেন খালেদ, কেন্টের হয়ে অভিষেকে নিলেন ৮ উইকেট

>> রাশিয়ার তেল কিনলে ভারতেও ১০০% পর্যন্ত শুল্কের ক্ষমতা, ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় বিল

>> ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়ন উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নের দাবি

>> ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১ হাজার শয্যায় রোগী প্রায় ৪ হাজার, বারান্দা-মেঝেতেও চিকিৎসা

>> ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় নেতাদের বৈঠক, হুতিদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের গোপন আলোচনা

আপনি পড়ছেন : মৌলভীবাজার

শত বছরের পশ্চিম বাজার, হাট থেকে রেমিট্যান্সনির্ভর বাণিজ্যকেন্দ্র


Rabeya ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:২৯



শত বছরের পশ্চিম বাজার, হাট থেকে রেমিট্যান্সনির্ভর বাণিজ্যকেন্দ্র


মৌলভীবাজার শহরের প্রবেশপথে মনু নদ পার হয়ে এম সাইফুর রহমান সড়ক ধরে এগোলেই দেখা মেলে পশ্চিম বাজারের। শত বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা এই বাজার এখন শুধু স্থানীয় কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র।

প্রায় ছয় হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিস্তৃত পশ্চিম বাজারের ইতিহাস জড়িয়ে আছে মনু নদ ও পুরোনো হাটের সঙ্গে। একসময় নদীপথে পাট, কাঠ ও কৃষিপণ্যের বাণিজ্য ছিল এখানকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি। সময়ের সঙ্গে নদীপথের গুরুত্ব কমেছে, বদলেছে ব্যবসার ধরন। বর্তমানে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ ও দেশে ফেরার সময় তাঁদের কেনাকাটাকে ঘিরে বাজারটির বড় একটি অংশের ব্যবসা পরিচালিত হয়।

যেভাবে শুরু হয়েছিল বাজার

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ইতিহাস-অনুরাগী সৈয়দ আবদুল মতালিব রঞ্জুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮১০ সালে মনু নদের পশ্চিম তীরে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করেন জমিদার মৌলভী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ। তাঁর নাম থেকেই পরবর্তীতে জনপদটি ‘মৌলভীবাজার’ নামে পরিচিতি পায়।

প্রথমদিকে সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসত। স্থানীয় কৃষকেরা ধান, চাল, তেল, সবজি, হাওরের মাছ, শুঁটকি ও অন্যান্য পণ্য নিয়ে সেখানে আসতেন।

হাট থেকে রাজস্ব আদায়ের একটি প্রচলিত পদ্ধতি ছিল ‘তুলা’। ইজারাদার বা জমিদারের পক্ষ থেকে বিক্রেতাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে এই অর্থ বা পণ্য আদায় করা হতো। সেই আয়ই ছিল হাটের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎস।

নদীপথে জমজমাট বাণিজ্য

সড়ক যোগাযোগ বিস্তারের আগে মনু ও কুশিয়ারা নদীকে ঘিরে এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হতো। মনু নদ কুশিয়ারা নদীতে মিশেছে যে এলাকায়, সেই মনুমুখের কাছে একসময় গুরুত্বপূর্ণ একটি লঞ্চঘাট ছিল।

এই ঘাট দিয়ে লঞ্চ ও স্টিমারে পণ্য যেত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল, ভৈরব ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে। তখনকার ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল পাটের। কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা পাট প্রক্রিয়াজাত করে নৌপথে বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো।

কাঠের ব্যবসাও ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজকান্দি সংরক্ষিত বন, জুড়ী ও লাউয়াছড়ার পাহাড়ি এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে বড় বড় লগ নদীপথে আনা হতো। চা-শিল্পের প্যাকেজিংয়েও বিভিন্ন ধরনের কাঠ ব্যবহার করা হতো।

তবে ১৯৮৯ সালে সংরক্ষিত বনের গাছ কাটায় নিষেধাজ্ঞা এবং পরবর্তীতে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় কাঠ ও নৌপথের ব্যবসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

রেমিট্যান্সে বদলে গেছে বাজারের চেহারা

পুরোনো পাট ও কাঠের ব্যবসা হারিয়ে গেলেও পশ্চিম বাজারের বাণিজ্যিক গুরুত্ব কমেনি। বরং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থকে কেন্দ্র করে বাজারের ব্যবসার ধরন পাল্টে গেছে।

ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীরা ছুটিতে দেশে ফিরলে পশ্চিম বাজারে কেনাকাটা বেড়ে যায়। তাঁদের রুচি ও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক দোকানে আধুনিক সাজসজ্জা ও ব্র্যান্ডভিত্তিক পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, প্রবাসীরাই তাঁদের ব্যবসার অন্যতম প্রধান ক্রেতা। তাঁদের দেশে ফেরার মৌসুমে বিক্রি কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়ে।

রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির কারণে পশ্চিম বাজার ও এম সাইফুর রহমান সড়ক এলাকায় ব্যাংক ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন ব্যাংকের শাখা ও এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ী, বাজারের বিভিন্ন মালিক সমিতি, ব্যাংক কর্মকর্তা ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারটির বার্ষিক লেনদেন দুই থেকে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায় কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য

পশ্চিম বাজারের সঙ্গে শুধু আধুনিক ব্যবসা নয়, স্থানীয় কারুশিল্পেরও সম্পর্ক রয়েছে। একসময় কাঠের প্রাচুর্যকে কেন্দ্র করে এখানে ফার্নিচার ও বাদ্যযন্ত্র তৈরির ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। এখনো কয়েকটি দোকানে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র তৈরি ও বিক্রি হয়।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, একটি হারমোনিয়াম তৈরিতে প্রায় সাত দিন সময় লাগে। কাঠের মান ও নকশা অনুযায়ী এসব বাদ্যযন্ত্রের দাম ১২ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মূলধনের সংকটে রয়েছেন।

বেতের আসবাবও পশ্চিম বাজারের পুরোনো ঐতিহ্যের অংশ। সোফা, চেয়ার, দোলনা, মোড়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বেতের পণ্য এখনো পাওয়া যায়। পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে দেশে আসা প্রবাসীদের মধ্যে।

তবে কাঁচামালের সংকট, দক্ষ কারিগরের অভাব এবং প্লাস্টিক ও বোর্ডের তৈরি সস্তা আসবাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে বেতশিল্প টিকে থাকার চ্যালেঞ্জে পড়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সহজ ঋণ, সরকারি সহায়তা ও কাঁচামালের নিশ্চয়তা ছাড়া এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আরও সংকুচিত হতে পারে।

কৃষিপণ্যেও বেড়েছে বাইরের জেলার নির্ভরতা

একসময় পশ্চিম বাজার থেকে বিভিন্ন কৃষিপণ্য অন্য এলাকায় পাঠানো হলেও বর্তমানে বাজারটি অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে বাইরের জেলার ওপর নির্ভরশীল।

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন জাতের কলার বড় অংশ আসে রাজশাহী ও বগুড়া থেকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত পানও বরিশাল থেকে আনা হয়।

একসময় তিসি, কাউন ও চিনার মতো কৃষিপণ্যের ব্যবসা ছিল উল্লেখযোগ্য। এখন স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় এসব পণ্যের ক্ষেত্রে বাইরের এলাকার ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।

মাছের বাজারেও বদল

পশ্চিম বাজারের পাইকারি মাছের আড়ত বৃহত্তর সিলেটের মৎস্য অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অতীতে হাইল হাওর ও হাকালুকি হাওরের প্রাকৃতিক মাছের ওপর বাজারটি অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল।

বর্তমানে চিত্র পাল্টেছে। আড়তদারদের হিসাবে, বাজারে আসা মাছের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই বিভিন্ন পুকুর ও বাণিজ্যিক খামারে চাষ করা।

শীত মৌসুমে, বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, হাওর-বিলের প্রাকৃতিক মাছের সরবরাহ কিছুটা বাড়ে। বছরের অন্য সময় বাণিজ্যিক মাছই বাজারের প্রধান উৎস। প্রতিদিন ভোরে আড়তে কোটি টাকার মাছের লেনদেন হয়। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এসব মাছ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা ও রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা হয়।

উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ছে অবকাঠামোগত চাপ

ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটলেও পশ্চিম বাজার ও মৌলভীবাজার শহরে অবকাঠামোগত নানা সমস্যা রয়ে গেছে। সরু সড়ক, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের অভাবে যানজট নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে পণ্য নিয়ে আসা মালবাহী ট্রাকগুলো সরু ও বেহাল সড়কের কারণে নানা সমস্যায় পড়ে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়ে।

শহরের বিসিক শিল্প এলাকার অবস্থাও আশানুরূপ নয়। কয়েকটি স্থানীয় বেকারি কোনোভাবে চালু থাকলেও বেশ কিছু কারখানা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ বা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করার পর অব্যবস্থাপনার কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

সব মিলিয়ে পশ্চিম বাজার মৌলভীবাজারের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছে। জমিদারি আমলের ‘তুলা’ আদায়ের হাট থেকে শুরু করে পাট ও কাঠের ব্যবসা, এরপর নদীপথের পতন এবং বর্তমানে রেমিট্যান্সনির্ভর আধুনিক খুচরা বাজার—প্রতিটি পর্যায়েই সময়ের সঙ্গে বাজারটির চরিত্র বদলেছে।

আধুনিক শপিং মল ও ব্যাংকের পাশাপাশি এখনো এখানে বাদ্যযন্ত্রের দোকান, বেতের আসবাব, কলার আড়ত, মাছের বাজার, পান ও মুদিপণ্যের ব্যবসা পাশাপাশি চলছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করে যোগাযোগব্যবস্থা, পার্কিং, শিল্পঋণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা বাড়ানো গেলে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই বাজার ভবিষ্যতেও মৌলভীবাজারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।