ফেসবুকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে আনোজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি আপিল আদালত। এ ঘটনায় শ্রীলঙ্কায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার জীবন রক্ষায় দেশটির সরকার কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ নিয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৮ সেপ্টেম্বরের পর থেকে আনোজনের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা কোনো তথ্য পাননি। কূটনৈতিক তৎপরতা চলমান থাকায় এ বিষয়ে প্রকাশ্যে নতুন কোনো বক্তব্য না দিতে পরিবারকে শ্রীলঙ্কা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এখন পর্যন্ত সৌদি কর্তৃপক্ষ আনোজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানায়নি। ফলে কখন তার সাজা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অতীতে সৌদি আরবে কোনো কোনো মৃত্যুদণ্ড পরিবার বা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে আগাম না জানিয়েই কার্যকর করার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত শ্রীলঙ্কায় একটি হিন্দু তীর্থযাত্রাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিতর্ক থেকে। জুনের শেষ দিকে তীর্থযাত্রীদের অনুসরণ করা একটি কুকুরকে এক মুসলিম তরুণ লাথি মারছেন—এমন একটি ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে ধর্মীয় বিতর্ক শুরু হয়।
এরপর এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী হিন্দু ধর্মের একটি দেবতাকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেন বলে জানা যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় আনোজন তামিল ভাষায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে আনোজন ওই পোস্ট মুছে ফেলেন এবং ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের বক্তব্যের জন্য ক্ষমা চান। তবে তার আগেই মন্তব্যটির স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি তার কর্মস্থল ও সৌদি কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর জুলাই মাসে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার শুরুতে আল-আহসা ফৌজদারি আদালত আনোজনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৩০ লাখ সৌদি রিয়াল জরিমানা করেন। পরে সৌদি প্রসিকিউটররা শরিয়া আইনের আওতায় কঠোর সাজা চেয়ে আপিল করেন। ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল আদালত তার সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন।
আনোজনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে শ্রীলঙ্কা সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ২১ সেপ্টেম্বর তার পরিবারের সদস্যরা শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ছেলের জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করার আশ্বাস দেন।
এ মামলায় আইনি সহায়তা দিতে শ্রীলঙ্কার চার সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সৌদি আরব সফর করছে। দলের সদস্য ও প্রেসিডেন্টের আইনজীবী উপুল কুমারাপ্পেরুমা জানিয়েছেন, সৌদিতে আনোজনের মামলায় নিয়োজিত দুই আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা বৈঠক করবেন। মামলার বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হবে।
এদিকে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে আনোজনের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। তার ভাই হামসিদান জানান, টানা দুই দিন ভাইয়ের কোনো ফোন না পেয়ে তারা দূতাবাসকে বিষয়টি জানান। দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেওয়া হলেও পরিবার এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পায়নি।
সৌদি কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যবহারের সুযোগ সাধারণত থাকে না। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের কারণে সৌদি আরবে কঠোর সাজা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে অবসরপ্রাপ্ত সৌদি শিক্ষক মোহাম্মদ আল-গামদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে তার সাজা বাতিল করে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় বলে মানবাধিকার সংগঠন আলকস্ত জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে এক কোটির বেশি বিদেশি শ্রমিক রয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা এবং পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার অভাবে স্বল্প মজুরির অভিবাসী শ্রমিকরা দেশটির বিচারপ্রক্রিয়ায় তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।