স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের নাগরিকসেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের লক্ষ্য শুধু ভূখণ্ড অর্জন নয়; বরং নাগরিকদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন, বৈষম্যহীন পরিবেশ এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন নাগরিকসেবার গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি, সেই প্রশ্ন এখনো প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে সড়ক, সেতু, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। তবে অবকাঠামোগত অগ্রগতির পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতা, দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা এবং নাগরিকসেবার মান কতটা বেড়েছে, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। উন্নয়নের সুফল তখনই সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁরা দৈনন্দিন জীবনে তার প্রতিফলন দেখতে পান।
দেশের বিভিন্ন খাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রীসেবা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসা নাগরিক কিংবা বাংলাদেশে আগত বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিমানবন্দরই দেশের পরিচিতির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। অথচ এই জায়গায় সেবার মান নিয়ে অভিযোগ উঠলে তা দেশের ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা ও যাত্রীসেবার সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করেন। উন্নত দেশগুলোর বিমানবন্দর বাদ দিলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর কিছু বিমানবন্দরের সেবাব্যবস্থা থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীসেবার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। বিদেশ থেকে দেশে ফেরার সময় ইমিগ্রেশনের দীর্ঘ অপেক্ষা, লাগেজ পেতে বিলম্ব, পরিচ্ছন্নতা এবং যাত্রীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিয়ে অসন্তোষের কথা শোনা যায়। এসব সমস্যার কারণে দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে দেশে ফেরা মানুষের স্বস্তি ও আনন্দ অনেক সময় ব্যাহত হয়।
একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করা, দ্রুত লাগেজ সরবরাহ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলে তার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রবাসীরা দীর্ঘদিন বিদেশে পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান ও অসংখ্য পরিবারের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অথচ বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর তাঁদের বিমানবন্দরে নানা ধরনের ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হলে তা উদ্বেগের বিষয়। লাগেজ সংগ্রহে বিলম্ব, মালামালের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কিংবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেতে অসুবিধা—এসব অভিযোগের যথাযথ সমাধান থাকা প্রয়োজন।
একইভাবে হজ পালন শেষে দেশে ফেরা যাত্রীদের লাগেজ ও জমজমের পানি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলে তাঁদের জন্য তা বাড়তি কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বয়স্ক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ যাত্রীদের সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সেবাব্যবস্থা সাজানো প্রয়োজন।
যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এসব সমস্যার অনেকটাই সমাধান সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও ভিআইপিদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা ও প্রটোকলের ব্যবস্থা থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে এসব ব্যবস্থা যেন সাধারণ যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচল ও সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অযথা বাধা সৃষ্টি না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
জনগণের করের অর্থে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং জনসেবামূলক কার্যক্রমের ব্যয়ও রাষ্ট্রীয় অর্থ থেকেই বহন করা হয়। তাই সাধারণ নাগরিকদের মানসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একজন সাধারণ যাত্রী বিমানবন্দরে প্রবেশ করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যেন নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত ব্যবস্থাপনার অন্যতম লক্ষ্য। সেবার ক্ষেত্রে পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা বিশেষ প্রভাবের পরিবর্তে নিয়ম ও শৃঙ্খলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার মান উন্নয়নে শুধু অবকাঠামো সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষ জনবল, আধুনিক ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়।
ইমিগ্রেশন ও লাগেজ ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব কমানো, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, যাত্রীদের তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সেবার মান নিয়মিত মূল্যায়ন করে দুর্বলতা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা যাত্রী হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে যাঁরা ভালো সেবা নিশ্চিত করছেন, তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
একটি দেশের বিমানবন্দর শুধু যাত্রীদের যাতায়াতের স্থান নয়; এটি দেশের প্রশাসনিক দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও সেবার মানেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি। বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী, প্রবাসী কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবাই যেন বিমানবন্দরে এসে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশ পান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের উন্নয়নকে অর্থবহ করতে হলে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি জনসেবার মান বাড়াতে হবে। বিমানবন্দরের যাত্রীসেবায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে দেশের ভাবমূর্তি উন্নত হওয়ার পাশাপাশি নাগরিকদের আস্থাও বাড়বে।
স্বাধীনতার এত বছর পর নাগরিকদের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তাঁরা চান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দায়িত্বশীলভাবে কাজ করুক এবং সাধারণ মানুষ যথাযথ সেবা পাক। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটুক—এটাই সময়ের দাবি।